ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. প্রবাস

দুর্নীতিবাজকে ভোট দিয়ে সুশাসনের স্বপ্ন দেখাই আত্মপ্রবঞ্চনা

রহমান মৃধা | প্রকাশিত: ১১:৩০ এএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে নির্বাচিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে, ভালো থাকা যাবে, শান্তিতে থাকা যাবে এই আশা করা ২০২৬ সালে, তাও ভারতের প্রতিবেশী হয়ে, এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। আমি শতভাগ নিশ্চিত, এই সাধনা ব্যর্থ হবে। যেমনটি আমার পক্ষে সুইডেনের রাজা হওয়া কোনোদিন সম্ভব নয়।

যদিও বহুবার মনে মনে ভেবেছি, ইস! যদি আমি এমন একটি দেশের রাজা হতে পারতাম, যে দেশে কেউ না খেয়ে থাকে না, কারো শীতের কষ্ট বুঝিয়ে বলতে হয় না; যেখানে মানুষ যখন যা খুশি বলতে পারে, করতে পারে, অথচ অন্য কারো ন্যূনতম সম্মান ক্ষুণ্ন হয় না।

যেখানে সূর্য উঠুক বা না উঠুক, মানুষ জানে কখন সকাল হবে, কখন সন্ধ্যা হবে, কখন ছুটি, কখন কাজ, কখন বাজবে ঘণ্টা। সবকিছু যেন নিয়মে বাঁধা, অথচ সেই নিয়ম শ্বাসরোধ করে না; বরং নিরাপত্তা দেয়, আস্থা দেয়।

আকাশের মেঘ ফেটে হঠাৎ নরসেন তার মনোমুগ্ধকর হাসির রূপ দেখিয়ে মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সকাল এসে গেছে। আবার কোনো একদিন নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়, বসন্ত এসে গেছে। তারপর মনে করিয়ে দেয়, সামার এসে গেছে। আবার ধীরে করে বলে দেয়, দায়িত্ব পালনের সময় এসেছে। আহ! কী আনন্দ, ঘরে, বাইরে, আকাশে, বাতাসে। এ যেন সত্যিই এক অদ্ভুত অনুভূতির জ্বলন্ত অগ্নিগিরি, যা পোড়ায় না, বরং উষ্ণতা দেয়।

কিন্তু না, সেই রাজা হওয়া সম্ভব নয়। তবু আমি আমার মনের রাজা হতে পেরেছি। কারণ আমিও সেই সুযোগ সুবিধাগুলো অনুভব করতে পারি, সমানভাবে, যেভাবে অনুভব করেন একজন রাজা। আমি ভাবতে পারি, প্রশ্ন করতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি।

যখন এটা সম্ভব, তখন আমার ছোটবেলার সেই দিনগুলো, যেখানে আমি একটানা কুড়িটি বছর কাটিয়েছি, সেই দেশটাকে নিয়ে কেন আমি স্বপ্ন দেখতে পারব না। কেন ভাবব না, একদিন আমার সেই দেশ আবার স্বপ্নের মতো হয়ে উঠবে।

ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা।
তাহার মাঝে আছে দেশ এক,
সকল দেশের সেরা।
ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ,
স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে
পাবে নাকো তুমি।
ও সে সকল দেশের রাণী সে যে,
আমার জন্মভূমি।
সে যে আমার জন্মভূমি।

এই স্বপ্ন কোনো পালিয়ে যাওয়ার বিলাসিতা নয়। এই স্বপ্নই হলো টিকে থাকার শক্তি। স্বপ্ন দেখার সাহস হারালে দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পড়ে। আর স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে সাধারণ মানুষই একদিন ইতিহাসের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়।

নতুন বাংলাদেশ তখন কাগজে আঁকা কোনো মানচিত্র থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানুষের মননে, আচরণে এবং দায়বদ্ধতায় জন্ম নেওয়া একটি জীবন্ত রাষ্ট্র।

এই স্বপ্নের বিপরীতে যে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, সেটি আমাদের অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সামনে আসন্ন নির্বাচন। বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই শুধু উৎসব নয়, একই সঙ্গে ভয়, সন্দেহ আর হতাশার নাম। কারণ আমরা জানি, বহু রাজনীতিবিদ দুর্নীতি, প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে। সেই কালো অর্থ ব্যয় করা হয় ভোট কেনার কাজে। কোথাও নগদ টাকা, কোথাও উপহার, কোথাও ভয় দেখানো হয়। জালিয়াতি হয়। প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা চলে।

এরপর যারা ক্ষমতায় আসে, তারা দেশ গড়তে আসে না। তারা আসে নিজেদের হিসাব মেলাতে। রাষ্ট্র তখন আর নাগরিকের নিরাপত্তা বা মর্যাদার জায়গা থাকে না। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে লুটপাটের ক্ষেত্র। এভাবেই গত পঞ্চান্ন বছর ধরে একের পর এক প্রজন্ম দেখে এসেছে একই দৃশ্য। শুধু মুখ বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি। ফলাফল একই থেকেছে। দেশের বারোটা বেজেছে, আর সাধারণ মানুষ ক্রমেই নিঃস্ব হয়েছে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন আসে, তাহলে করণীয় কী। উত্তর খুব কঠিন নয়, কিন্তু সাহসের প্রয়োজন আছে। জনগণকে যাচাই বাছাই করতে হবে। কে সৎ, কে যোগ্য, কে সত্যিই মানুষের কথা বলে, আর কে কেবল ক্ষমতার ভাষা জানে, তা বুঝে নিতে হবে। আবেগ নয়, সম্পর্ক নয়, ভয় নয়, লোভ নয়। বিবেককে সামনে রাখতে হবে।

জুলুম যেখানে হবে, সেখানে প্রতিবাদ করতে হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখতে হবে। চুপ থাকা মানেই সম্মতি দেওয়া, এই সত্যটা বুঝতে হবে। একজন মানুষ একা দুর্বল হতে পারে, কিন্তু সচেতন মানুষ একত্র হলে শক্তি তৈরি হয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনগণ জেগে উঠলে কোনো ব্যবস্থাই টিকে থাকতে পারে না।

সবাই যদি সচেতন হয়, তবে সবকিছুই সম্ভব। পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি মানুষের সিদ্ধান্তের ফল। ভোট শুধু একটি কাগজে সিল মারা নয়। ভোট হলো ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। সঠিক মানুষকে ভোট দেওয়া মানে একটি শিশুর আগামী নিরাপদ করা, একজন বৃদ্ধের সম্মান রক্ষা করা, একটি দেশের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখা।

স্বপ্নের বাংলাদেশ তাই আকাশ থেকে নামবে না। সেটিকে গড়ে তুলতে হবে বাস্তবতার ভেতর দিয়েই। স্বপ্ন দেখার সাহস রাখতে হবে, আবার সেই স্বপ্ন রক্ষা করার দায়িত্বও নিতে হবে। তাহলেই ধনধান্য পুষ্পভরা সেই বাংলাদেশ কেবল কবিতায় নয়, মানুষের জীবনে ফিরে আসবে।

আরেকটি সত্য আমাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে। তেলমারা বন্ধ করতেই হবে। শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেশের মানুষের তেল ব্যবহারের যে ন্যক্কারজনক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা পুরো জাতিকে ধীরে ধীরে দাসে পরিণত করেছিল। যেমন বানর কাঁধ পেয়ে মাথায় উঠে বসে, তেমনি অন্ধ আনুগত্য ও সুবিধাবাদী প্রশংসা শেখ পরিবারকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্র আর জনগণের সম্পত্তি ছিল না, হয়ে উঠেছিল পারিবারিক সম্পদ।

নতুন প্রজন্মের দূরদর্শী নেতৃত্বে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছিল, এটি সত্য। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, মুহূর্তের মধ্যেই আবার নতুন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, আমলা, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য পর্যায়েও কৌশলগত তেলমারা শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশ আবার ঠিক সেই পুরোনো পথেই হাঁটতে শুরু করেছে বলে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

পরিবারতন্ত্র একটি ভয়াবহ সামাজিক রোগ, একটি মহামারি ভাইরাসের মতো। এর বিরুদ্ধে লড়াই করাই এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এটি মাদকাসক্তির মতোই এক ভয়ংকর বদঅভ্যাস। এখনই যদি এই কুসংস্কার নির্মূল না করা হয়, তবে জাতি আবার মাতাল হয়ে পড়বে ক্ষমতার মোহে। বাংলাদেশ কোনো পরিবারের নয়। এই ফয়সালা আমরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাঠেই দিয়ে এসেছি। তাহলে সেই আবর্জনা আবার কীভাবে আমাদের সমাজে ঢোকার সুযোগ পায়। যদি আমরা এই কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিই, তবে সমাজ আবার গোলামি, দাসত্ব এবং অবৈধ শাসনের অধীনে চলে যাবে। আর যদি সেটাই হওয়ার কথা ছিল, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, ভদ্র মহিলা শেখ হাসিনাকে পালাতে হলো কেন।

এতকিছুর পরও পরিশেষে এতটুকু বলি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পতন ঘটেছিল। ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। ২০২৬ সালে পতন ঘটাতে হবে চাঁদাবাজদের। তবে এই লড়াইয়ে নামতে গিয়ে আমাদেরই যেন দুর্নীতিগ্রস্ত না হতে হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কেউ কেউ আদর্শের আড়ালে দুর্নীতিতে জড়িয়েছিল। ২০২৪ সালেও অনেকে বাহবা পাওয়ার হিসাব কষে এমন কাজ করেছে, যার জন্য প্রশংসার বদলে জাতির কাছ থেকে ঘৃণার বাণী শুনতে হচ্ছে। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়। ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে একই ভুল বারবার ফিরে আসে। তাই এবার শিখতে হবে, যেন আমরা আর একবারও সেই পথে না হাঁটি।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম