নবী নুহের (আ.) দাওয়াত ও অবিশ্বাসীদের ৫ অভিযোগ
নবী নুহের (আ.) দাওয়াত ও অবিশ্বাসীদের ৫ অভিযোগ। ছবি: ক্যানভা
মওলবি আশরাফ
হজরত আদমের (আ.) ইন্তেকালের কয়েকশো বছর পরে শয়তানের ধোঁকায় মানুষ ধীরে ধীরে মূর্তিপূজা করতে শুরু করে। এ সময় আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে একজন নবী পাঠান—যিনি এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেন, শিরক থেকে বিরত থাকতে বলেন; তার নাম হজরত নুহ (আ.)। কোরআনে তার নামে একটি সুরা আছে এবং ২৮টি সুরায় ৮১টি আয়াতে তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত নুহ (আ.) সাড়ে নয়শো বছর বেঁচে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়কালে অক্লান্তভাবে তিনি দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। নিজের জাতিকে বলেছেন, হে আমার জাতি, তোমরা আল্লাহর এবাদত করো, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নাই। তবু কি তোমরা সাবধান হবে না? (সুরা মুমিনুন: ২৩)
কিন্তু কেউ তার দাওয়াতে সাড়া দেয়নি। বরং তার সম্প্রদায়ের লোকেরা কানে আঙ্গুল দিয়ে কিংবা নিজেকে কাপড় দিয়ে আড়াল করে সটকে পড়েছে, তার সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করেছে। এটা ছিল নিত্যদিনের গল্প। এরপরও ধৈর্য ধরে তিনি শুধু দাওয়াত দিয়ে গেছেন। সব অবহেলা সয়ে শুধু আল্লাহর কথা বলেছেন।
হজরত নুহের (আ.) জাতির অবিশ্বাসীরা তাকে বিভিন্নভাবে তাকে কষ্ট দিয়েছে। তার দাওয়াতে সাড়া না দেওয়ার, তাকে অনুসরণ না করার বিভিন্ন অজুহাত তারা হাজির করেছে। কোরআনে নুহের প্রতি তার জাতির অবিশ্বাসীদের পাঁচটি অভিযোগের কথা বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক নবী-রসুলের প্রতিই অবিশ্বাসীরা এই পাঁচটি অভিযোগ করে থাকে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা সবগুলো অভিযোগেরই জবাব দিয়েছেন।
প্রথম অভিযোগ: তুমি তো আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ, কোনো ফেরেশতা নও, তাহলে তোমাকে আল্লাহর নবী হিসেবে মানতে হবে কেন?
জবাব: আল্লাহ যাকে নির্বাচিত করেন, তিনিই নবী হন। কেউ নিজের প্রচেষ্টায় নবী হতে পারে না। আল্লাহ মানুষের জন্য মানুষের মধ্য থেকেই নবী নির্বাচন করেন। কিন্তু যে কাফের সে কুফুরি করবেই। আল্লাহ যদি কোনো ফেরেশতাকে নবী বানিয়ে পাঠাতেন, তবুও তারা সংশয় প্রকাশ করত। (সুরা আনআম: ৯)
দ্বিতীয় অভিযোগ: তুমি যেসব কথাবার্তা বলো, বাপ-দাদা কারও মুখে এমন কথা শুনিনি। বাপ-দাদার মতাদর্শ ত্যাগ করবে তোমার নতুন মতাদর্শ আমরা গ্রহণ করবো কেন?
জবাব: কোনো কথা বাপ-দাদার কাছে শুনলেই যে ঠিক হবে এমন না। মানুষের জ্ঞানচর্চায় একটা ধারাবাহিকতা আছে, আগের কারও কথা পরে ভুল প্রমাণিত হতে পারে। মৌলিকভাবে আমাদের দেখতে হবে যিনি কথা বলছেন তিনি সত্যবাদী কিনা। (সুরা আরাফ: ৬১-৬২)
তৃতীয় অভিযোগ: তোমার আসল ধান্ধা হলো ক্ষমতা, তুমি আমাদের নেতা হতে চাও।
জবাব: হজরত নুহ (আ.) বলেন, এই দাওয়াতের বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোনো ধন-সম্পদ বা বিনিময় চাই না। আমার পুরস্কার তো শুধু বিশ্বপালকের নিকটেই রয়েছে। (সুরা শুআরা: ১০৯)
চতুর্থ অভিযোগ: তোমার সঙ্গী-সাথী হলো সমাজের সব নিম্নশ্রেণির জাহেল লোকজন। অভিজাত লোকেরা তোমার ধার ধারে না।
জবাব: হজরত নুহ (আ.) বলেন, আমি কোনো (দরিদ্র) ইমানদার ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হবে। বরং আমি দেখছি তোমরাই জাহেল। (সুরা হুদ: ২৯)
সমাজের অভিজাত বেশিরভাগ লোক ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকে। পার্থিব সৌন্দর্য তাদের অন্ধ করে রাখে। তাই তারা খুব কমই সত্যের অনুসন্ধান করে। বিপরীতে দরিদ্ররা সত্যের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়। ফলে প্রত্যেক নবীর সহচরদের মধ্যে দরিদ্র লোকদের সংখ্যাই সব সময় বেশি ছিল।
পঞ্চম অভিযোগ: তুমি তো নেতা বা সম্পদশালী কেউ নও। তাহলে তুমি কীভাবে নবী হলে? আমরা তোমার অনুসরণ কেন করবো?
জবাব: হজরত নুহ (আ.) বলেন, আমি তোমাদের বলি না, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার আছে, আর না আমি গায়েব জানি এবং আমি এটাও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। (সুরা হুদ: ৩১)
অর্থাৎ একজন নবীর মূল দায়িত্ব মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা, তার নেতা বা সম্পদশালী হওয়া জরুরি নয়। আল্লাহ তাআলা তার ইচ্ছা অনুযায়ী তার কোনো বান্দাকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেন। নবীদের কাছে আল্লাহর ধন-ভাণ্ডারের কর্তৃত্ব থাকে না। তিনি শুধু আল্লাহর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
মূলত এই প্রত্যেকটা অভিযোগই ছিল অজুহাত, তার জাতি আল্লাহর সত্য দ্বীন গ্রহণ করার জন্য, তাকে অনুসরণ করার জন্য এসব অজুহাত হাজির করেছিল। তারপরও নুহ (আ.) অসীম ধৈর্যশীলতার সাথে তার দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যান।
লোকজন অভিযোগ করবেই, কিন্তু আমাদের নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে—হজরত নুহের (আ.) জীবন থেকে আমরা এই শিক্ষাই পাই।
ওএফএফ