দরুদ শরিফের গুরুত্ব ও ফজিলত
ইলিয়াস মশহুদ
দরুদ পাঠ করলে অশেষ সাওয়াব, রহমত, বরকত লাভ হয়। রাসুলের (সা.) ওপর দরুদ পড়তে খোদ আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত ও দরুদ পেশ করেন। হে মুমিনরা, তোমরাও তার প্রতি সালাত পেশ করো এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৬)
নবীজির নাম শোনার পর যদি ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পড়া না হয়, তাহলে গুনাহগার হতে হবে। কোনো আলোচনায় বা মাহফিলে যদি নবীজির নাম উচ্চারণ করা হয়, তবে প্রথমবার ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা ওয়াজিব। এরপর যতবার তার নাম নেওয়া হবে, ততবার ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা মুস্তাহাব।
দরুদ পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে বেশ কিছু হাদিসেও। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, যে আমার ওপর একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন। (সহিহ মুসলিম: ৭৯৭)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হবে, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমার ওপর দরুদ পড়বে। (সুনানে তিরমিজি: ৪৮৪)
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, যে আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন, তার ১০টি পাপ ক্ষমা করা হবে এবং মর্যাদার ১০টি স্তর বাড়িয়ে দেওয়া হবে। (সুনানে নাসাঈ: ১২৯৭)
রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার ওপর সকাল ও সন্ধ্যায় ১০ বার করে দরুদ পাঠ করে, সে কেয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভ করবে। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস: ১৭০২২)
আওস ইবনে আওস (রা.) থেকে বর্ণিত; রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। সুতরাং ওই দিন তোমরা আমার ওপর বেশি করে দরুদ পড়ো। কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়। সাহাবিরা বললেন, আল্লাহর রাসুল, আপনি তো (মারা যাওয়ার পর) পচে-গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন, সে ক্ষেত্রে আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে? তিনি বললেন, আল্লাহ মাটির জন্য নবীদের দেহ খাওয়া হারাম করে দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)
আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, সেই ব্যক্তির নাক ধুলোধূসরিত হোক, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হলো; অথচ সে (আমার নাম শুনেও) আমার প্রতি দরুদ পড়ল না। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৫)
আবু মুহাম্মাদ কা’ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) একবার আমাদের কাছে এলেন। আমরা বললাম, আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতি কীভাবে সালাম পেশ করতে হয় তা জেনেছি; কিন্তু আপনার প্রতি দরুদ কীভাবে পাঠাব? তিনি বললেন, তোমরা বলো, “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ও আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা আলে ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুন মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ও আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা আলে ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুন মাজিদ।”
অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের ওপর দরুদ পেশ করুন; যেমন দরুদ পেশ করেছিলেন ইবরাহিমের পরিবারবর্গের ওপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও অতি সম্মানিত। হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ ও তার পরিজনবর্গের প্রতি বরকত নাজিল করুন; যেমন বরকত নাজিল করেছিলেন ইবরাহিমের পরিজনবর্গের প্রতি। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত ও মহাসম্মানী। (সহিহ বুখারি: ৩৩৭০)
উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাতের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে লোকেরা, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। কম্পন সৃষ্টিকারী প্রথম শিঙ্গাধ্বনি এসে পড়েছে এবং এর পরই আসবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। উবাই (রা.) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর রাসুল, আমি তো অধিক হারে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়ে বেশি করলে এতে তোমারই কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরুদ পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দরুদ পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভালো। আমি বললাম, তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার ওপর দরুদ পাঠে কাটিয়ে দেবো? তিনি বললেন, তাহলে তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে। (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৭)
হাদিসে বর্ণিত দরুদ
আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা সা’দ ইবনে উবাদার মজলিসে বসা ছিলাম। এমন সময় রাসুল (সা.) আমাদের কাছে এলেন। বাশির ইবনে সা’দ বললেন, আল্লাহর রাসুল, মহান আল্লাহ আপনার প্রতি দরুদ পড়তে আমাদের আদেশ করেছেন; কিন্তু কীভাবে আপনার ওপর দরুদ পড়ব? রাসুল (সা.) তখন নিরুত্তর থাকলেন। পরিশেষে আমরা আশা করলাম, যদি তিনি প্রশ্ন না করতেন! (অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম ভাবলেন নবীজি (সা.) অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাই এই প্রশ্ন না করলেই ভালো হতো) খানিক পর রাসুল (সা.) বললেন, তোমরা বলো, “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ও আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা আলে ইবরাহিম, ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদ, ও আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুন মাজিদ।”
আবু হুমায়েদ সায়িদি (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কীভাবে আপনার প্রতি দরুদ পেশ করব? তিনি বললেন, তোমরা বলো, “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আজওয়াজিহি ওয়া জুররিয়াতিহি, কামা সাল্লাইতা আলা আলি ইবরাহিম, ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলা আজওয়াজিহি ওয়া জুররিয়াতিহি, কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহিম, ইন্নাকা হামিদুন মাজিদ।”
অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ এবং তাঁর স্ত্রী ও বংশধরের ওপর দরুদ প্রেরণ করুন, যেমন পাঠিয়েছিলেন ইবরাহিমের বংশধরের ওপর। আর আপনি মুহাম্মাদ এবং তার স্ত্রী ও বংশধরদের ওপর বরকত বর্ষণ করুন, যেমন বরকত বর্ষণ করেছিলেন ইবরাহিমের বংশধরদের ওপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত, গৌরবান্বিত। (সহিহ বুখারি: ৩৩৬৯)
আরও পড়ুন:
হাদিসে বর্ণিত নবীজির (সা.) ৭ দরুদ
ছোট দরুদ
জায়েদ ইবনে খারিজা (রা.) বলেন, আমি নবীজিকে (দোয়া-দরুদের ব্যাপারে) প্রশ্ন করলাম। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তোমরা আমার ওপর সালাত (দরুদ) পড়ো এবং বেশি করে দোয়া করতে চেষ্টা করো। (আমার জন্য দরুদ পড়ার সময় তোমরা) এভাবে বলো, “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ও আলা আলি মুহাম্মাদ।” অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ এবং তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (সুনানে নাসাঈ: ১২২৫)
ওএফএফ