সানজিদাকে দেখে রাখবেন সে আমার মেয়ের মতো
বদলি হয়ে চলে গেছেন গতকাল (সোমবার)। কাঁদিয়ে গেছেন পুরো উপজেলার মানুষকে। হৃদয়জুড়ে কতটা স্থান দখল করে থাকলে রক্তের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকা মানুষগুলোর চোখ দিয়ে পানি ঝরানো সম্ভব তা বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বদলির কথা জানতে পেরে কয়েকদিন ধরে কেঁদেছে তারাই, যারা এই মানুষটির সহযোগিতায় কখনো হাসপাতালে, কখনো থানায়, কখনো বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন।
বদলিজনিত অফিসিয়াল কার্যক্রম ও সংবর্ধনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরও তিনি খোঁজ নিয়েছেন অসহায় মানুষগুলোর। খোঁজ নিয়েছেন টাকার অভাবে যারা ফরম পূরণ করতে পারছিল না সেই সব স্কুল ছাত্রছাত্রীর।20161115210859.jpg)
সংবর্ধনার ছবি ফেসবুকে দেয়ার পর অনেকেই কমেন্ট করেছেন সেখানে। প্রকাশ করেছেন কৃতজ্ঞতা। করেছেন ব্যাপক প্রশংসা। সাধুবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাহসী পদক্ষেপ নেয়ায়। এতক্ষণ যে মানুষটির বর্ণনা করছিলাম, তা অতি সামান্য। এর চেয়েও অনেক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য তিনি। এমনটা জানা গেল এলাকার বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে।
মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়া এই মানুষটি হলেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার নির্বাহী অফিসার (বদলি) শামীম আহমেদ। ২০১৪ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই উপজেলার অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
গতকাল বিদায় বেলায় উপজেলা চত্বরে সর্বস্তরের মানুষ সংবর্ধনা জানায় এই মানুষটিকে। সংবর্ধনার ছবি ফেসবুকে আপলোড করার পর সেখানেও স্মৃতিচারণ ও প্রশংসার ঝড় তুলে মন্তব্য করেন শতাধিক ফেসবুক ব্যবহারকারী।
ফারুক হোসেন কাহার নামে একজন লিখেছেন, ‘স্যার আপনাকে কোনো দিন ভুলতে পারবো না। আপনার কাছে যতদিন অসহায়দের জন্য গিয়েছি কোনোদিন মন খারাপ করে আসতে হয়নি বরং চাওয়ার চেয়ে বেশিই পেয়েছি। আপনি আর্তমানবতার সেবায় যে ভূমিকা রেখেছেন তা ভুলবার নয়।’ তার এই মন্তব্যের উত্তর দিতে গিয়ে শামীম আহমেদ লিখেছেন, সানজিদাকে দেখে রাখবেন। সে আমার মেয়ের মতো।20161115210826.jpg)
হাসিবুল হক নামে এক ইউপি চেয়ারম্যান মন্তব্য করেছেন, ‘স্যার চেয়ারম্যান হিসেবে মাত্র কয়েক মাস আপনার সান্নিধ্য পেয়েছি। এতেই আপনি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন।
আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি নতুন সূর্য ওঠার সাথে সাথে শাহজাদপুরের সর্বস্তরের মানুষ বুঝতে পারবে তারা কি হারিয়েছেন। আমার বিশ্বাস আপনার মতো অভিভাবক লক্ষ কোটিতে মেলা ভার।’ এমন অসংখ্য মন্তব্য করেছেন অনেকেই।20161115210836.jpg)
কে এই সানজিদা : সানজিদা হলো তিন বছর বয়সী এক শিশু। গত ৮ মাস ধরে সে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। বাড়ি উপজেলার পাঠানপাড়ায়। বাবা বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। ইটভাটায় কাজ করেন। এ কারণে তাকে বাইরে থাকতে হয়। সানজিদার বয়স যখন দেড় বছর তখন তার মা তাকে রেখে চলে যান। এরপর থেকে সঙ্গী হন দাদি। বর্তমানে দাদির আদর যত্নে বড় হয়ে উঠছে সে।
জন্ম থেকেই সানজিদা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। পরিবারের লোকজন প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। পরে বুঝতে পারলেও অভাবের কারণে ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়নি। সানজিদার দাদি লোকমুখে শুনেছিলেন ইউএনও সাহেব বেশ দয়ালু মানুষ। মানুষের উপকার করেন।
এ কথা শোনার পরই নাতনিকে নিয়ে হাজির হন শামীম আহমেদের অফিসে। সেখানে সানজিদাকে দেখে খুব কষ্ট অনুভব করেন শামীম আহমেদ। এরপর তিনি সানজিদার দাদিকে পাঠান খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখানে প্রফেসর ডা. এমএ হাইয়ের চিকিৎসা নেয় সানজিদা। ঘটনাটি আট মাস আগের।
ডাক্তার জানান, প্রতি মাসে তিনবার রক্ত দিতে হবে সানজিদাকে। তাকে পুরোপুরি সুস্থ করতে ৭০ লাখ টাকার প্রয়োজন। এরপর থেকে সানজিদার রক্ত জোগানে পাশে এসে দাঁড়ান ফারুক হোসেন কাহার ও রাসেল নামে দুই যুবক।
আর প্রতিবার রক্ত দেয়ার খরচ বহনের দায়িত্ব নেন শামীম আহমেদ। এরপর থেকে তিনি প্রতিদিন সানজিদার জন্য তাদের বাড়িতে দুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তখন শামীম আহমেদের বাসায় একটি গরু ছিল। গরুটি গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার পর সানজিদার দুধের ঘাটতি পূরণে তার দাদিকে টাকা দেয়া শুরু করেন তিনি।
সানজিদাকে রক্ত দেয়ার জন্য যে টাকা খরচ হতো তা অগ্রিম সার্কেল শাহাদাতপুর নামে একটি সংগঠনের কর্ণধার কাহার ও রাসেলের কাছে জমা দিতেন তিনি। এখনো ১০ হাজার টাকা সেখানে জমা রয়েছে বলে জানান ফারুক হোসেন কাহার।20161115210848.jpg)
এ ব্যাপারে কাহার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যতবার যত অসহায় মানুষকে নিয়ে স্যারের কাছে গেছি ততবারই সহযোগিতা পেয়েছি। কখনো খালি হাতে ফেরত আসতে হয়নি।’
সানজিদাকে তো স্যার নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন। তা না হলে নিজের বাড়ি থেকে কেউ কারো জন্য দুধ পাঠায়। যাওয়ার দিন স্যারের চোখগুলো ছলছল করছিল। ভেতরের কান্নাটা আমি দেখেছি। কারণ মানুষটিকে খুব কাছ থেকে চিনি।
কথা হয় উপজেলার আরেক তরুণ সমাজসেবক মামুন বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানান, আমার প্রতিটা কাজের সফলতার পেছনে শামীম স্যারের অবদান রয়েছে। তার মতো মানুষ আর কিছুদিন থাকলে আমরা আরো এগিয়ে যেতাম। তার জন্য অনেক তরুণ এখন সমাজসেবার দিকে ঝুঁকছে। এটা সমাজের জন্য একটা শুভ লক্ষণ।
এসব বিষয়ে কথা হয় বদলি ইউএনও শামীম আহমেদের সঙ্গে। তিনি জানান, জীবনের স্বার্থকতা হলো মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে নেয়া। মানুষের মাঝে বেঁচে থাকা। সেটাই করার চেষ্টা করেছি শাহজাদপুরে।
আর সানজিদা, সে তো আমার আরেক মেয়ে। তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারলে নিজের কাছে ভালো লাগতো। যেখানেই থাকি তারপরও চেষ্টা করবো সানজিদার পাশে থাকার। তার খোঁজখবর নেয়ার।
প্রসঙ্গত, শামীম আহমেদ স্বাস্থ্য সচিবের পিএস হিসেবে যোগদান করবেন আগামীকাল বুধবার।
এমএএস/আরআইপি