ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. বিশেষ প্রতিবেদন

চায়ের চুমুকে সম্প্রীতির খোশ-গল্প

প্রকাশিত: ১১:৫৩ এএম, ২৩ নভেম্বর ২০১৬

মঙ্গলবার দুপুর ১২টা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনের একটি চায়ের দোকানে বসে খোশ-গল্প করছিলেন কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নাসিরনগরের হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে কথা বলছিলেন তারা। মুসলমানদের সঙ্গে সেই খোশ-গল্পে মত্ত ছিলেন কয়েকজন হিন্দু বয়োজ্যেষ্ঠও। তাদের খোশ-গল্পে ফুটে উঠেছিল চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র।

খোশ-গল্পের ফাঁকেই মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই প্রিয় বন্ধু শৈলেন চৌধুরী ও আবু তাহেরের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের এই প্রতিবেদকের।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই উপজেলা সদরের বাসিন্দা আবু তাহের জানান, উপজেলা সদর ইউনিয়নের কাশীপাড়া মহল্লার বাসিন্দা শৈলেন চৌধুরীর সঙ্গে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রায় ৪০ বছরের। সম্পর্কটা যতটা না বন্ধুত্বের তারচেয়েও বেশি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এবং আত্মিক। একটা সময় নাসিরনগরে মুসলমানদের চেয়ে হিন্দু বাসিন্দাদের সংখ্যাই ছিল বেশি। আমরা হিন্দুদের সঙ্গেই সামাজিকতা রক্ষা করে একসঙ্গে বসবাস করে আসছি। শৈলেনের চাচার সঙ্গে আমার বাবার সম্পর্ক অনেক ভালো ছিল। সেই সূত্র ধরে ছোটবেলা থেকেই শৈলেনদের বাড়িতে আমি আসা যাওয়া করি। আমি আর শৈলেন একসঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। কখনো শৈলেনকে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মনে করিনি। নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে একে অপরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

আবু তাহের আরও জানান, ৩০ অক্টোবর হামলার দিন আমি ব্যবসায়িক কাজে রংপুরে ছিলাম। পরে ৩ নভেম্বর বাড়ি ফিরে ঘটনার কথা শুনে শৈলেনের বাড়ি ছুটে গিয়েছি। শৈলেনসহ পরিচিত অন্য ক্ষতিগ্রস্তদের মনে সাহস জুগিয়েছি। তাদের দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।

আবু তাহেরের বন্ধু শৈলেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এবং তাহের কখনোই একে অপরকে আলাদা মনে করি না। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে চলাফেরা করছি। আমার কোনো বিপদ হলে তাহের এগিয়ে আসে আবার তাহেরের কোনো বিপদ হলে আমিও তার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, এখনো দুই বন্ধু এক সঙ্গে চা না খেলে চলেই না। আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।’

নাসিরনগরে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির খ্যাতি রয়েছে জেলাজুড়ে। গত ৩০ অক্টোবর দুষ্কৃতকারীরা সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করার জন্যই হিন্দুপল্লীতে হামলা চালিয়েছিল বলে দাবি করে জেলা প্রশাসন। তবে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে আগের সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখনো অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

নাসিরনগর উপজেলার ফুলপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বাকী জাগো নিউজকে জানান, আমাদের উপজেলায় হিন্দু-মুসলমান কোনো বিভাজন নেই। আমার বাড়ির আশপাশে অনেক হিন্দু পরিবার রয়েছে, আমরা সবাই একসঙ্গে বসবাস করি। হামলার পর থেকে আমিসহ অনেক মুসলমান হিন্দুদের ঘর-বাড়ি পাহারা দিচ্ছি। হামলার ঘটনায় আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একটুও নষ্ট হয়নি।

Nasirnagar

উপজেলার দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা নিধু রাম দত্ত জাগো নিউজকে জানান, আমরা হিন্দু-মুসলমান আলাদা নই। হামলার সময় প্রতিবেশী মুসলমানরা আমাদের রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছেন। আমাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট আছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

উপজেলা সদরের বাসিন্দা ও চিত্রশিল্পী মো. সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, গত সোমবার আমাদের এক হিন্দু প্রতিবেশীর বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। যদি আমাদের মধ্যে সম্প্রীতি না থাকতো তাহলে তো বিয়েতে আমাদের নিমন্ত্রণ করা হতো না।

তবে নাসিরনগর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল জ্যোতি দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, হামলার ঘটনায় মুসলমানদের সঙ্গে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল, তবে ধীরে ধীরে সেটি আগের জায়গায় ফিরে আসছে। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের ওপর ফের হামলা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছিল, সেই আতঙ্ক ধীরে ধীরে কাটছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে পুলিশের ভূমিকায় আমরা সন্তুষ্ট।

এদিকে নাসিরনগরে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পুলিশ। প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও গ্রামে সাধারণ মানুষদের নিয়ে উঠোন বৈঠক ও সম্প্রীতি সমাবেশ করছে পুলিশ। এসব সমাবেশ থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের মনে লুকিয়ে থাকা ভয়ভীতি দূর করার পাশাপাশি সবসময় তাদের পাশে থাকারও আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, আমরা মানুষের আস্থা অর্জন করে নাসিরনগরের আগের সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের চেষ্টা করছি। হামলা-পরবর্তী ভীতিপূর্ণ পরিস্থিতি কেটে গিয়ে এখন অনেকটাই শান্তিপূর্ণ নাসিরনগর। হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে আমরা নিয়মিত উঠোন বৈঠক ও সম্প্রীতি সমাবেশ করছি।

উল্লেখ্য, গত ২৯ অক্টোবর ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরিফ নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র করে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মামলায় গ্রেফতার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ (৩০) দাসের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে নাসিরনগর উপজেলা। পরদিন (৩০ অক্টোবর) মাইকিং করে সমাবেশ ডাকে দুটি ইসলামী সংগঠন। সমাবেশ শেষ হওয়ার পরপরই দুষ্কৃতকারীরা নাসিরনগর উপজেলা সদরে তাণ্ডব চালায়। এসময় দুষ্কৃতকারীরা উপজেলার অন্তত ১০টি মন্দির ও শতাধিক ঘর-বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এরপর ৪ নভেম্বর ভোরে ও ১৩ নভেম্বর ভোরে দুষ্কৃতকারীরা আবারও উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়েরর অন্তত ৬টি ঘর-বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এসব ঘটনায় নাসিরনগর থানায় পৃথক সাতটি মামলা হয়েছে। মামলায় এখন পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ দেখে ৮৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এমএএস/আরআইপি