ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. বিশেষ প্রতিবেদন

জোড়াতালি দিয়ে চলছে বেনাপোল কাস্টমস হাউস

প্রকাশিত: ০৩:১১ এএম, ১০ এপ্রিল ২০১৬

দীর্ঘ দিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অর্ধেকেরও বেশি পদ শূন্য। নিয়োগ প্রক্রিয়া না থাকায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে বড় স্থল পথে রাজস্ব আদায়কারী এ প্রতিষ্ঠান। কমিশনার থেকে শুরু করে ৪র্থ শ্রেণির ৩২টি ক্যাটাগরিতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৪১টি। আর বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৬৮ জন। ১৭৩টি পদই শূন্য।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কাজের পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সে অনুপাতে কাস্টমস হাউসের লোকবল বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। বছরে ২৫ লাখ টনের বেশি আমদানি-রফতানিকৃত পণ্য হ্যান্ডলিং হচ্ছে এ বন্দরে।  

২০০০ সালের ১৩ নভেম্বর বেনাপোলে পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস কমিশনারেট স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু পরিধি অনুযায়ী লোকবল নিয়োগ হয়নি। দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ ট্রাক পণ্য আমদানি ও ১৫০ ট্রাক পণ্য রফতানি হয়। বছরে রাজস্ব আহরণ হয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে কাস্টমসের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা একাধিকবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে জানিয়েছেন। কিন্তু এখনও কোনো সুরাহা হয়নি।

কাস্টমস সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এত বেশি জনবল ঘাটতির কারণে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি পণ্যের শুল্কায়ন, মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্যের কায়িক পরীক্ষা, অভিযোগের শুনানি, বিরোধ নিষ্পত্তি, রাসায়নিক পরীক্ষা, লাইসেন্স, বন্ড, নিলামসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাশাপাশি কাস্টমস হাউজের সেবা গ্রহণকারী স্টেকহোল্ডাররাও নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, সর্বাধিক সংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার। ১২০টি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ২ জন নারীসহ ৪৭ জন। শূন্য রয়েছে ৭৩টি পদ। এডিশনাল ও যুগ্ম কমিশনারদের দুইটি করে পদ থাকলেও বর্তমানে আছেন একজন করে। উপ-কমিশনারের ৪টি পদের বিপরীতে আছেন তিনজন। প্রোগ্রামারের একটি পদই শূন্য। সহকারী কমিশনারের ১৩ পদের মধ্যে ৩টি শূন্য, একজন মাতৃকালীন ছুটিতে। রাসায়নিক পরীক্ষকের একটি পদই শূন্য। রাজস্ব কর্মকর্তার ২৩ পদের মধ্যে আছেন ২২ জন। একজন করে আইন কর্মকর্তা, সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক, অডিটর ও সহকারী হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তৃতীয় শ্রেণির স্টাফের ১৫১ পদের বিপরীতে আছে ৭১ জন, বাকি ৮০টি পদ শূন্য। চতুর্থ শ্রেণির ১৮ পদের বিপরীতে রয়েছে ৯ জন। ৯টি পদই খালি।

বেনাপোল কাস্টসি হাউসে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। বন্দর থেকে সময় মতো মালামাল খালাস করতে না পারায় মোটা অংকের লোকসান গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফলে বিলম্বিত হচ্ছে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া। শতকরা ৫০ ভাগ কাজ দিনে দিনে ডেলিভারি হলেও বাকি কাজ পরে থাকছে দিনের পর দিন।

আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, পরীক্ষণ গ্রুপে লোকবল কম থাকায় সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া আমদানিকৃত প্রায় পণ্য চালানে স্যাগ (স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট গ্রুপ) এর নাম থাকায় আমদানিকৃত এসব পণ্য ৩ দিনেও পরীক্ষণ করতে পারছেন না কর্মকর্তারা। আমদানিকৃত পণ্য একজন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে পরীক্ষণ করে পণ্য চালান শুল্কায়ন করা হয়ে থাকে। পরীক্ষণের জন্য সিরিয়াল দিয়ে থাকতে হচ্ছে দিনের পর দিন। শতভাগ পরীক্ষার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হাতে গোনা ২/৪টি পণ্য চালান ২/১ দিনে পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও বাকি পণ্য চালান পরে থাকছে দিনের পর দিন। প্রতিটি পরীক্ষণ গ্রুপে ২/৩ জন পরীক্ষণ কর্মকর্তার পক্ষে শতভাগ পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

একদিকে পণ্য চালান পরীক্ষণ ও পরীক্ষণ প্রতিবেদন লেখা অন্যদিকে পণ্য চালান খালাস দেয়া কষ্ট সাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আমদানিকারকদের প্রতিনিধি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে কখন পণ্য চালান পরীক্ষা হবে তার আশায়। তারপর অধিকাংশ বিল অব এন্ট্রি সিদ্ধান্তের জন্য উপরের বিভিন্ন কর্মকর্তার টেবিলে পাঠানোর কারণেও তা বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে সরকারি রাজস্ব আদায় বিলম্বের পাশাপাশি ফাইল জমে থাকছে পরের দিনের জন্য।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি কামাল উদ্দিন শিমুল জানান, জনবল ঘাটতির কারণে পণ্য ছাড় করতে দেরি হচ্ছে। একজন কর্মকর্তাকে দু-তিনজনের কাজ করতে হচ্ছে। যে কারণে আমদানিকারকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের এক মোটরপার্টস আমদানিকারক জানান, পণ্য আমদানি করে তা খালাস নিতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পেছনে ধরনা দিতে হয়। নানা অজুহাতে তারা সময় ক্ষেপণ করেন।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও আমদানিকারক মিজানুর রহমান খান বলেন, দেশের বড় স্থলবন্দর হওয়ার কারণে বেনাপোলে কাজের চাপ বেশি। কেননা বেশির ভাগ পণ্য আমদানি হয়ে থাকে এ বন্দর দিয়ে। তাই কাস্টমসের জনবল ঘাটতি কাম্য নয়। জনবল কম থাকলে ব্যবসায়ীরা পণ্য ছাড়করণে হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।

এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার এএফএম আবদুল্লাহ খান জানান, জনবলের ঘাটতি আমাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কাস্টমস হাউসের বেসিক জনবল সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার বেশির ভাগ পদই খালি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কম জনবল নিয়েই দেশের সর্ববৃহৎ স্থল পথে রাজস্ব আহরণকারী এ কাস্টমস হাউসের বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে হচ্ছে।

এসএস/এমএস