ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. খেলাধুলা

ভারতে খেলতে যাওয়া নিয়ে বিসিবির কয়েকদফা মিটিংয়ে কী আলোচনা হয়েছে?

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশিত: ১০:৩৩ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন, মোহাম্মদ আশরাফুল এবং ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন আগের দিনই স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন— বাংলাদেশের কোনোভাবেই ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা উচিত হবে না।

যারা এক মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, তারা পুরো বাংলাদেশ জাতীয় দলের নিরাপত্তা কিভাবে দেবে? এই প্রশ্ন তোলেন তারা। তাদের মতে, এর চেয়ে ভিন্ন কোনো দেশে বিকল্প ভেন্যুতে খেলার প্রস্তাব দেওয়া উচিত বাংলাদেশের।

শুধু সুজন, আশরাফুল ও মিঠুনই নন— বাংলাদেশের প্রায় সব ক্রীড়া অনুরাগীর মতও ছিল একই। গোটা জাতি তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকে!

আশ্বস্ত হওয়ার মতো খবর হলো— বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শেষ পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। আইসিসির কাছে চিঠি দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না।

গতকাল ৩ জানুয়ারি সিলেটে বিসিবির একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্বোধন শেষে তাৎক্ষণিকভাবে বোর্ড অব ডিরেক্টর্সকে নিয়ে একটি অনলাইন সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মধ্যরাতে আরেক দফা বৈঠক এবং আজ রোববার সকালে আরও একদফা অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষে বিসিবি আইসিসিকে ই-মেইল করে জানিয়ে দেয়— বর্তমান পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা সম্ভব নয়। তাই ভিন্ন দেশে বিকল্প ভেন্যুতে ম্যাচ স্থানান্তরের অনুরোধ জানানো হয়।

এদিকে বিসিবির কয়েকদফা বৈঠক নিয়ে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন, কানাঘুষা ও ফিসফাস। বলা হচ্ছে, বিসিবির সভায় নাকি ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ না খেলার বিষয়টি সেভাবে আলোচনাই হয়নি। এমনকি বোর্ড নিজ থেকে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি— সরকারের চাপেই নাকি পরিচালনা পর্ষদ এমন অবস্থান নিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে— সরকারের চাপ না থাকলে বিসিবি হয়তো মধ্যপন্থা অবলম্বন করত।

তাহলে আসল ঘটনা কী? বিসিবির একাধিক অনলাইন মিটিংয়ে আসলে কী আলোচনা ও পর্যালোচনা হয়েছিল? বোর্ড কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন?

এই বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন বিসিবির কয়েকজন পরিচালক। নাজমুল আবেদিন ফাহিম, ইফতিখার রহমান মিঠু ও আমজাদ হোসেন— তিনজনই একই সুরে কথা বলেছেন।

তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো, ‘বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের অনলাইন মিটিংয়ে শুরু থেকেই একটি বিষয় ঘুরে ফিরে আলোচনায় এসেছে। সেটি হলো, মোস্তাফিজের ব্যাপারে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে আইপিএলের বাইরে ছিটকে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কার্যত বোঝানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ভারতে নিরাপদ নন।’

সে জায়গা থেকেই প্রশ্ন ওঠে, ‘একজন ক্রিকেটার যেখানে নিরাপদ নন, সেখানে পুরো জাতীয় দল কিভাবে নিরাপদ থাকবে? তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বই বা কে নেবে? তাই শুরু থেকেই বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একবারের জন্যও এমন কথা ওঠেনি যে, আইসিসি যদি নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়, তাহলে বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে।’

নাজমুল আবেদিন ফাহিম রোববার দুপুরে জাগো নিউজকে জানান, তারা বিকল্প ভেন্যুতে খেলা স্থানান্তরের প্রস্তাবই দিয়েছেন এবং সেই অনুযায়ী চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বিসিবির পরিচালক ও মিডিয়া কমিটি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন আজ রাতে জাগো নিউজকে পুরো মিটিংগুলোর বিবরণ দেন। তিনি বলেন,
‘আমরা গতকাল রাতে সিলেটেই দুবার বসেছি। পরে আরও একবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। শুরু থেকেই সবাই একটি বিষয়ে একমত ছিলাম— আমরা বিকল্প চাই।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোস্তাফিজ ইস্যুকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিকল্প ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো পথ ছিল না। আলোচনা করে সেই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। আমজাদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা সরাসরি- ভারতে খেলব না- এমন কথা না বললেও বিকল্প ভেন্যু চাই মানেই তো ভারত ছাড়া অন্য কোথাও খেলা স্থানান্তরের কথা।’

তিনি জানান, রোববার সকালে ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিসিবি সভাপতির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং ভারতের মাটিতে না খেলার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানান। সে আলোকেই বিষয়টি সরাসরি ঘোষণা আকারে এসেছে।

বিসিবির মিটিং ও আলোচনা নিয়ে যেসব কানাঘুষা চলছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি। তার সোজা কথা, ‘বিশ্বকাপের মতো একটি মেগা ইভেন্টে নির্ধারিত সূচি ও ভেন্যু রেখে খেলতে যাবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারই দেয়। ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যই আমরা সরকারের নির্দেশনা হিসেবে ধরে নিয়েছি। সে অনুযায়ীই আইসিসিকে জানানো হয়েছে যে, আমরা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলব না।’

অপর পরিচালক ইফতিখার রহমান মিঠুও একই সুরে কথা বলেন। তার ভাষায়, ‘আমরা ভারতে নিরাপদ নই— এ অবস্থানেই শুরু থেকে ছিলাম। তাই বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাব বোর্ড সভায়ই উঠেছে।’

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হলো- বিসিবি পরিচালকরাও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারতে না খেলার পক্ষেই ছিলেন। সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্য ও নির্দেশনা সেই সিদ্ধান্ত নিতে তাদের আরও দৃঢ় করেছে।

সবশেষ কথা হলো— পরিস্থিতি যত ঘোলাটে ও জটিলই হোক না কেন, মোস্তাফিজ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট সম্পর্ক যতই অবনতি ঘটুক না কেন, জাতীয় দল ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে কি না— এই সিদ্ধান্ত মূলত সরকারেরই। বোর্ডের নয়।

ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সিরিজ বন্ধ থাকা বা একে অপরের দেশে গিয়ে না খেলার বিষয়টি যেমন বিসিসিআই ও পিসিবির চেয়েও বেশি দিল্লি ও ইসলামাবাদের ওপর নির্ভর করে, তেমনি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেই সময়োচিত নির্দেশনা এসেছে বিসিবির কাছে। বিসিবি সেই নির্দেশনা মানতে বাধ্য এবং সেটাই হয়েছে।

এআরবি/আইএইচএস/