বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বয়কট: গুজব না বাস্তবতা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ত্বরিৎ গতি ও লাগামহীন পথচলার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনলাইন তো বটেই, অনেক সময় গণমাধ্যমও খেই হারিয়ে ফেলছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই–বাছাইয়ের ন্যূনতম সময়টুকু পাওয়া পর্যন্ত দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতে আমাদের জাতীয় দল, সমর্থককুল ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা আছে। তাই আমরা ভারতের মাটিতে না খেলে শ্রীলঙ্কার মাটিতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে চাই—বাংলাদেশের এই দাবির প্রতি পাকিস্তান তথা পিসিবি সহমত পোষণ করে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছে, অর্থাৎ বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে চায়—এমন খবর আগের দিন পড়ন্ত বিকেল থেকেই পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
আজ সোমবার দুপুরে আবার শোনা যায়, শুধু পাশে দাঁড়ানোই নয়, বাংলাদেশের প্রতি দরদ দেখিয়ে এবং বিসিবির দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করবে পাকিস্তান। বলে রাখা ভালো, এই দুটি খবরের একটিও কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের অফিসিয়াল বক্তব্য নয়। জিও নিউজ ও পাকিস্তান অবজারভারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, তাদের সূত্রের বরাতে এসব সংবাদ প্রকাশ হয়েছে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুটি খবরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবির প্রতি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড নৈতিক সমর্থন দিতেই পারে। কারণ বিসিবি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও বোঝা যায়, বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল নিজের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং বাংলাদেশের দাবির প্রতি সমর্থন চেয়েছেন। এতে করে আইসিসির কাছে বাংলাদেশের দাবিটি আরও জোরালো হবে এবং আইসিসি অন্তত ভাবতে বাধ্য হবে যে বাংলাদেশ একা নয়, আরও কয়েকটি দেশ বিসিবির পক্ষে আছে। ধরে নেওয়া যায়, এখানেও তেমনটাই ঘটেছে।
নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য বিসিবি পিসিবিসহ আরও কয়েকটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ আইসিসি প্রেসিডেন্ট জয় শাহ ভারতের হলেও বাকি পর্ষদ ভারতের নয়। সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে আছেন। তাদের সমর্থন থাকলে বাংলাদেশের দাবি জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সেই তালিকায় পাকিস্তান হতে পারে প্রথম পছন্দ। সবার জানা, পাকিস্তানও ভারতের মাটিতে খেলে না। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচসহ গ্রুপের সব ম্যাচই তারা শ্রীলঙ্কায় খেলবে। একমাত্র বাংলাদেশকে ‘সি’ গ্রুপ থেকে ‘বি’ গ্রুপে স্থানান্তর করা গেলেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকে থাকবে। নইলে এবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটেই পিসিবি হয়তো বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে এবং সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে নিজেরাই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াবে পাকিস্তান।
প্রথম ও শেষ কথা হলো— পাকিস্তান কেন সেটা করবে? সত্য, বর্তমানে পিসিবি ও বিসিবির মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রয়েছে। বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও পিসিবি চেয়ারম্যান মাহসিন নাকভির মধ্যে ভালো বোঝাপড়া আছে। তাই বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবির পক্ষে পাকিস্তানের অকুণ্ঠ সমর্থন মোটেও অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও ক্রিকেটীয় সম্পর্ক পাকিস্তানের দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। তারপরও বাংলাদেশের প্রতি দরদ দেখিয়ে বিশ্বকাপ বয়কট করার মতো অবস্থায় পাকিস্তান নেই।
এতে পাকিস্তানের লাভ কী? তাদের খেলা নিয়ে তো কোনো সংশয় বা শঙ্কা নেই। পাকিস্তানের সব ম্যাচই শ্রীলঙ্কায়। আর পরের পর্বে উঠলেও পাকিস্তান ভারতে খেলবে না— এটা আগেই নির্ধারিত। কাজেই শুধু বাংলাদেশের দাবি মানা না হলে পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াবে—এমন ভাবনাই বা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো আইসিসির মেগা ইভেন্ট না খেলার অর্থ হলো বড় অঙ্কের ‘পার্টিসিপেশন মানি’ থেকে বঞ্চিত হওয়া। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলার পেছনে যুক্তি থাকলেও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো যুক্তি নেই। তাহলে তারা কী কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়াবে?
পিসিবি বলতে পারে— আমরা বাংলাদেশের দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করছি। এই বক্তব্য দিয়েই তারা আইসিসির সর্বোচ্চ ফোরামে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সেই কারণে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় এবং তারা তা করবেও না। করলে আইসিসির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ তৈরি হবে।
পাকিস্তান গণমাধ্যমের খবরের সূত্র ধরে বলা যায়, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান সরকার ও পিসিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে নৈতিক সমর্থন চেয়েও থাকে, তাতে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বর্জনের প্রশ্নই ওঠে না। তারা বরং বাংলাদেশের পক্ষে অন্য দেশগুলোর নৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারে বা করবে। এর বাইরে বাস্তবিক অর্থে পিসিবির করার মতো আর কিছুই নেই।
এআরবি/আইএইচএস