ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. খেলাধুলা

বিশ্বকাপ নিযে মুখোমুখি আইসিসি-বিসিবি, দায় কার?

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশিত: ১০:৫৪ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২৬

কি হবে, তা বোঝাই যাচ্ছিল। মোস্তাফিজুর রহমান ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয় দল, ভক্তকুল এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে শঙ্ক প্রতাশ করে বাংলাদেশ শুরু থেকেই ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার কথা বলে আসছে।

‘আমরা ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলব না। আমাদের শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার ব্যবস্থা করা হোক’— এটাই ছিল বিসিবির দাবি। বিপরীতে আইসিসিও বারবার বিসিবিকে ভারতের মাটিতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার কথা বলেছে।

নানা আলোচনা ও বৈঠকের পরও দুই পক্ষের কেউই অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। বাংলাদেশ বারবার নিজেদের দাবির প্রতি অনঢ় ছিল। অন্যদিকে আইসিসিও ঘুরেফিরে বাংলাদেশকে ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার কথাই বলেছে।

ক’দিন আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইসিসির প্রতিনিধি দল ও বিসিবির শীর্ষ কর্তাদের বৈঠকেও দুই পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় ছিল। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, আইসিসি কোনোভাবেই বাংলাদেশের দাবি মানবে না।

এটা যে শুধুই ভারতের পক্ষ নেওয়ার কারণে— ভারতের বর্তমান শাসক দল বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ আইসিসির চেয়ারম্যান— তা নয়। ফিকশ্চার ও ফরম্যাট চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর হুট করে একটি দলের সব ম্যাচ অন্য দেশে স্থানান্তর করায় রয়েছে নানা বাধা-বিপত্তি। সেগুলো অতিক্রম করে অন্য গ্রুপের দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের সম্মতিতে বাংলাদেশকে ‘সি’ গ্রুপ থেকে ‘বি’ গ্রুপে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় খেলার ব্যবস্থা করা বাস্তবতার নিরিখে ছিল অত্যন্ত কঠিন।

এত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশের দাবির প্রতি আইসিসির সদয় হওয়াও খুব একটা সম্ভব ছিল না। কাজেই ধরেই নেওয়া হয়েছিল, আইসিসি কিছুতেই বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বিশ্বকাপ খেলার অনুমতি দেবে না। বলবে, ভারতেই খেলতে হবে। নইলে বিশ্বকাপ থেকে ‘ফরফিট’ (বাজেয়াপ্ত/বাদ)।

সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীরা মনে মনে এমনটাই ধরে রেখেছিলেন। তারপরও একটি ছোট অংশের ধারণা ছিল, যেহেতু শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানও বাংলাদেশের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে এবং আইসিসিকে চিঠিও দিয়েছে, তাই হয়তো ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই ঘটেনি। আইসিসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে— ভারতের মাটিতে আগে থেকে নির্ধারিত ফিকশ্চার ও গ্রুপিং বহাল থাকবে। বাংলাদেশকে ভারতে গিয়েই খেলতে হবে। অন্যথায় বিশ্বকাপ খেলা হবে না।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় আইসিসির বৈঠকে ভোটাভুটির মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। পাকিস্তান ছাড়া ১৫ দেশের ক্রিকেট কর্তাদের কেউই বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেননি। সব মিলিয়ে এক হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ হয়েছে।

এর অর্থ দাঁড়ায়— ১৯৯৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলা শুরুর পর এই প্রথম কোনো ফরম্যাটে বিশ্বকাপ খেলছে না বাংলাদেশ। বলে রাখা ভালো, ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর পর কোনো আসরই বাদ যায়নি টাইগারদের। এবারই সেই বৈশ্বিক আসরে খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের।

ক্রিকেটকে যারা ভালোবাসেন, যাদের কাছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে ক্রিকেট— তারা হতাশ। প্রিয় জাতীয় দল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে না—এ ভাবনাতেই তাদের মন ব্যথায় ভরে উঠছে।

আজ সন্ধ্যা থেকে এই হতাশার মাঝেই জেগেছে কিছু প্রশ্ন। একটি প্রশ্ন সবার মনেই উঁকি দিচ্ছে, এই যে বাংলাদেশ ২৭ বছর পর কোনো বৈশ্বিক আসরে প্রথমবার নেই, তার দায় কার?

এক কথায় এর জবাব দেওয়া কঠিন। দায় খুঁজতে গেলে সবার আগে প্রশ্ন উঠবে ভারতের উগ্র ধর্মীয় সংগঠন, প্রচারমাধ্যম এবং বিসিসিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে।

বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে দীপু দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বোঝানোর চেষ্টা করে যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই, হিন্দুরা ভালো নেই, তাদের জীবন বিপন্ন।

এর প্রতিবাদে তারা কলকাতা নাইট রাইডার্সের বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজের ওপর চড়াও হয়। মোস্তাফিজ যেন আইপিএল খেলতে না পারে— এ দাবিতে সোচ্চার হয় ওই সংগঠনগুলো। ভারতীয় প্রচারমাধ্যমও সেই দাবি ও উসকানিমূলক বক্তব্যগুলো ফলাও করে প্রচার করে আগুনে ঘি ঢালে। এতে বিসিসিআই নিরাপত্তার কথা ভেবেই হোক কিংবা আইপিএল আয়োজন নিরাপদ করতেই হোক— মোস্তাফিজকে আইপিএলের বাইরে রাখার কথা জানায়। কেকেআর তা মেনে নিয়ে হুট করেই মোস্তাফিজকে আইপিএল খেলতে নিষেধ করে।

অনেক সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীর মতে, বিসিসিআইয়ের শীর্ষ কর্তারা আরও ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তাদের অবশ্যই ভাবা উচিত ছিল, মোস্তাফিজকে এভাবে আইপিএল থেকে সরিয়ে দিলে বাংলাদেশে কঠিন ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে নাও চাইতে পারে।

এক সময় রাজসিং দুঙ্গারপুর, মাধব রাও সিন্ধিয়া, ইন্দরজিত সিং বিন্দ্রা ও জগমোহন ডালমিয়ার মতো বিজ্ঞ, তুখোড় ও ঝানু ক্রিকেট সংগঠকরা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনা করতেন। কিন্তু এখন যারা আছেন, তারা সেই মানের কাছাকাছি নন। তাই ধর্মীয় নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য ও প্রচারমাধ্যমের একপেশে প্রচারণা দেখেই মোস্তাফিজকে হুট করে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান বিসিসিআই নেতৃত্ব। সেটাই ছিল মূল সমস্যা।

সেই সময় বিসিসিআই যদি ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিত, ভুত-ভবিষ্যৎ ভেবে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ না দিত, তাহলে আজকের এই উত্তেজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

এবার আসা যাক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও সরকারের দায়ের কথায়। ভারতের নেতিবাচক আচরণ, একপেশে মানসিকতা ও ধর্মের রঙ লাগানো অবস্থান দেখে বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা ও বিসিবিও না ভেবে সরাসরি এক ধরনের ‘এক্সট্রিম রিঅ্যাকশন’-এ চলে যায়।

যে রাতে বিসিসিআই জানায় মোস্তাফিজ আইপিএল খেলবেন না, সেই রাতেই ক্রীড়া উপদেষ্টা বলে বসেন, ‘আমরা ভারতের এই একপেশে সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং আমরা বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাব না।’ বিসিবিও একই সুরে বলে, ‘ভারতের মাটিতে গিয়ে আমরা বিশ্বকাপ খেলব না।’

এই বক্তব্য সরাসরি না দিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও বিসিবি চাইলে একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারত। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা কমিটি ভারতে পাঠানো যেত। সেই কমিটি ভারত সরকার, আইসিসি ও বিসিসিআইয়ের নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দিত। সেই প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে তখন বলা যেত, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমরা সন্তুষ্ট নই, তাই খেলতে যাব না।

কিন্তু শুরুতেই সোজাসাপ্টা ‘না’ বলায় ভারতও অনড় থাকে। আর তারই প্রতিফলন আইসিসির আলটিমেটাম, ভারতে গিয়ে খেললে খেলো, নইলে বাদ। শেষ পর্যন্ত হয়তো বিশ্বকাপ থেকে বাদই পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এআরবি/আইএইচএস/