এবার বড় দলের বিপক্ষে জয়ের নায়ক হতে পারবেন সাকিব?
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি (১০৪ ম্যাচে ২১৯৯) রান আর উইকেট (১০৪ ম্যাচে ১২২ উইকেট) তার। খুব স্বাভাবিকভাবেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টপ স্কোরার আর উইকেট শিকারীও সাকিব।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে ৩১ ম্যাচে তিনটি হাফ সেঞ্চুরি সহ সাকিবের মোট রান ৬৯৮। সর্বোচ্চ ৮৪। গড় ২৬.৮৪, স্ট্রাইকরেট ১২৪.৬৪। এতো গেল ব্যাটার সাকিবের কথা। বোলার সাকিবও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারিও।
৩১ ম্যাচে সাকিবের উইকেট ৪১টি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বোলারদের সেরা বোলিং স্পেলটা অবশ্য তার দখলে না। তারপরও দ্বিতীয় সেরা বোলিংয় ফিগারের ৪/৯ মালিক সাকিবই। একমাত্র বাংলাদেশি বোলার হিসেবে সর্বাধিক ৩ বার ৪ উইকেট শিকারের কৃতিত্বটাও সাকিবের।
ব্যাট ও বল হাতে যার পারফরমেন্স এত উজ্জ্বল, খুব স্বাভাবিকভাবেই দলগত পারফরমেন্সেও সাকিবের অবদান প্রচুর। এক কথায় সাকিবই টিম বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি। ব্যাটিং আর বোলিং দুই বিভাগেই সাকিবই সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। তার ব্যাটিং আর বোলিংয়ের ওপরই নির্ভর করে বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতা। এটা প্রমাণিত যে সাকিবই টিম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রধান শক্তি?

সাকিবের ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে ওঠার নির্ভর করে বাংলাদেশের সাফল্য। এইতো নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সবে শেষ হওয়া তিনজাতি আসরেও দেখা মিললো সে সত্যের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঠিক আগে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশ আর পাকিস্তানকে নিয়ে হওয়া ওই আসরে বাংলাদেশ সব ম্যাচ হারলেও শেষ দুই খেলায় সাকিবের দল তুলনামূলক ভালো ক্রিকেট উপহার দিয়েছে।
সেখানেও সাকিবই ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। প্রথম দুই খেলায় রান খরায় ভোগা বাংলাদেশ শেষ দুই ম্যাচে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড আর পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬০ এবং ১৭৩ রান করেছে। দুটি ম্যাচেই বাংলাদেশের টপ স্কোরার ছিলেন সাকিব। প্রথমে নিউজিল্যান্ডের সাথে ৭০ আর পরের খেলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬৮ রানের দু’দুটি কার্যকর ইনিংস উপহার দিয়েছেন সাকিব। ওই দুই ইনিংসের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ শেষ দুই খেলায় মোটামুটি লড়াই করে।
মোটকথা এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে সাকিবের ব্যাট জ্বলে উঠলেই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দৈন্য দশা, জীর্র্ন-শীর্ণ অবস্থা কেটে যায়। স্কোর বোর্ড একটু হলেও মোটাতাজা হয়। তাই ভাবা হচ্ছে বিশ্বকাপেও সাকিবের ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের স্কোরলাইন।

বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টিতে আগে তিন-তিনবার ম্যাচ সেরার কৃতিত্ব আছে সাকিবের। প্রথমবার ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে। শেরে বাংলায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮ রানে ৩ উইকেট শিকারের পর ১০ রানে অপরাজিত থেকে হন ম্যাচ সেরা।
আর গতবছর আরব আমিরাতে হওয়া সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওমান আর পাপুয়া নিউগিনির সঙ্গেও ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন সাকিব। দুটি ম্যাচেই অলরাউন্ড পারফরমেন্সে (ওমানের সঙ্গে ৩/২৮ ও ৪২ রান এবং পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ৪/৯ ও ৪৬ রান) দল জিতিয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কার পান সাকিব।
তবে একটা কাকতালীয় বাপার আছে। বিশ্বকাপে সাকিব তিনটি হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে একবারের জন্যও দল জেতাতে পারেননি। এরমধ্যে ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার পাল্লেকেলেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৫৫.৫৫ স্ট্রাইকরেটে ৫৪ বলে ৮৪ রানের এক ঝড়ো ইনিংসও আছে।
ওই ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ পায় ৬ উইকেটে ১৭৫ রানের বড়সড় স্কোর; কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। পাকিস্তানের সে সময়ের তরুণ ওপেনার ইমরান নাজিরের ২০০.০০ স্ট্রাইকরেটে ৩৬ বলে ৭২ রানের উত্তাল ইনিংসের মুখে বাংলাদেশের ১৭৫ রান খুব অনেক বলেই প্রতিয়মান হয়। পাকিস্তান পায় ৮ উইকেটের সহজ জয়।

এর বাইরে বিশ্বকাপে আরও একজোড়া ফিফটি আছে সাকিবের। একটি ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে। শেরে বাংলায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫২ বলে ৬৬ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেও দল জেতাতে পারেননি সাকিব। তার ওই ফিফটির ওপর ভর করে বাংলাদেশ পায় ১৬৩ রানের লড়াকু পুঁজি। ওপেনার অ্যারোন ফিঞ্চের ৪৫ বলে ৭১ রানের উত্তাল ইনিংসের ওপর ভর করে তা অনায়াসে টপকে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সাকিবের শেষ ফিফটি পাকিস্তানের সাথে। সেটা ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। কোলকাতার ইডেন গার্ডেনে পাকিস্তানের ২০১ রানের বড়সড় স্কোরের জবাবে বাংলাদেশ করে ১৪৬ রান। সাকিবের ব্যাট থেকে আসে একমাত্র ফিফটি (৪০ বলে ৫০ রান)।
আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। তাহলো, বিশ্বকাপে সাকিবের ম্যাচ জেতানো নৈপুণ্য ও ম্যাচসেরা হওয়ার রেকর্ড আছে শুধু আফগানিস্তান, ওমান পাপুয়া নিউগিনির মত দলের বিপক্ষে। কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তির সঙ্গে এখনও পর্যন্ত ম্যাচ উইনিং পারফরমেন্সে নেই।
তা থাকবে কি করে? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কোনো বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ই মাত্র একটি। সেটাতো সেই ২০০৭ সালে। ১৫ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক হয়ে আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

কিন্তু জানেন কি, সে ম্যাচে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সাকিব বল হাতে ৩৪ রানে ৪ উইকেট দখল করলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয়ের যৌথ রূপকার ও স্থপতি নায়ক বনে যান মোহাম্মদ আশরাফুল (২৭ বলে ৬১ রানের টর্নেডো ইনিংস) আর আফতাব আহমেদ (৪৯ বলে ৬২) ৪ উইকেট শিকারের পর ব্যাট হাতে ৯ বলে ১৩ রানে আউট হয়ে সাকিব আর ম্যাচ সেরা পারফরমারের পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হননি।
এবার কি সাকিব বড় দলের বিপক্ষে ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে টিম বাংলাদেশকে জয় উপহার দিতে পারবেন? আফগানিস্তান, ওমান আর পাপুয়া নিউগিনি নয়, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের (এটা নির্ভর করবে ওই দুই দলের প্রাথমিক পর্বের ফলের ওপর) মত বড় দলের তকমাধারীদের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ জেতানো সাকিবের হাতে উঠবে ম্যাচ সেরা পারফরমারের পুরস্কার? সেটাই দেখার।
এআরবি/আইএইচএস