নেদারল্যান্ডস আর জিম্বাবুয়েকে হারাতে পারবে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের ভিনদেশি কোচদের নিয়ে ভক্ত ও সমর্থক মহল বরাবরই অসন্তুষ্ট। তাদের কোচিংয়ে টিম বাংলাদেশের কতটা উন্নতি হয়েছে বা আদৌ কোন অগ্রগতি হয়েছে কি না- তা নিয়ে বিরাট প্রশ্ন আছে কমবেশি সবার মনে। পাশাপাশি শেরে বাংলার প্রধান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার পারফরম্যান্স নিয়েও আছে নানা কথাবার্তা। গামিনি আসলে কী করেন? তাকে চড়া মূল্যে মাসোহারা দিয়ে কী লাভ হচ্ছে? তা নিয়েও আছে রাজ্যের আলোচনা-সমালোচনা।
তবে অবশেষে গামিনি বোধহয় একটা প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করতে পেরেছেন। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে তার তৈরি কচ্ছপগতি আর নিচু বাউন্সি পিচে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ে ওপরে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ। যে কারণে এবার আর টাইগারদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব বা বাছাইয়ে বাধা পার হতে হয়নি। হলে কি হতো? মূল পর্ব তথা সুপার টুয়েলভে খেলা সম্ভব হতো কি না সে প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি-ঝুকি দিচ্ছে।
গামিনীর বানানো সেই স্লো ও লো পিচে অসি ও কিউইদের সঙ্গে সিরিজ বিজয়ে বাংলাদেশকে প্রথম পর্ব খেলতে হয়নি। খেললে সাকিবের দলের কি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো পরিণতি হতো না? সে প্রশ্নও অনেকের।

যাই হোক, যে উইকেটে যাকে হারিয়েই আসুক না কেন, বাংলাদেশকে প্রথম পর্ব খেলতে হয়নি। সাকিবের দল এখন সেরা বারোর লড়াইয়ে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হবে। এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটি কেমন কাটবে টাইগারদের?
সোমবার (২৪ অক্টোবর) হোবার্টের বেলেরিভ ওভালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নামবে সাকিব বাহিনী। বিশ্বকাপের মূল পর্বে জয়ের দেখা নেই বললেই চলে। সেই ২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ১৩ সেপ্টেম্বর জোহানেসবার্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়ই প্রথম এবং শেষ। এরপর মূল পর্বে আর কোনো ম্যাচ জেতেনি বাংলাদেশ।
আসলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে টিম বাংলাদেশের ব্যর্থতাই সঙ্গী। ঘরের মাঠে হংকংয়ের কাছে হার। ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে আয়ারল্যান্ডের কাছে পরাজয় আর সবশেষ গতবার আরব আমিরাতের দুবাই, শারজা আর আবুধাবিতে প্রায় অনুকূল পরিবেশ প্রেক্ষাপট পেয়েও বাংলাদেশ পারেনি। এমনকি স্কটল্যান্ডের মতো দলের সাথেও হেরেছে।
তবে আগের বার মূল পর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর শ্রীলঙ্কাকে হারানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। ক্যারিবীয়দের ১৪২ রানে আটকে দিয়েও মাত্র ৩ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ। শেষ ওভারে ১৩ রান দরকার ছিল। আন্দ্রে রাসেলের বলে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আর আফিফ ৯ রানের বেশি তুলতে পারেননি। একটি ছক্কা বহু দূরে বাউন্ডারিও হাঁকাতে পারেননি কেউ। আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৭১ রানের লড়াকু পুঁজি গড়েও ৫ উইকেটে হেরে যায় ৭ বল আগে।
এবার কি হবে? বাংলাদেশ কি মূল পর্বে অধরা জয়ের দেখা পাবে? না পারার শেকল ছিন্ন করে ব্যর্থতার প্রাচীর ভেঙে সাকিবের দল কি এবার সুপার টুয়েলভে জয় তুলে নিতে পারবে?

ভারত ও পাকিস্তানকে হারানোর কথা সেভাবে না ভাবলেও কেউ কেউ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়ের চিন্তাও করছেন; কিন্তু তারা মাথায় আনেননি যে খেলাটা অস্ট্রেলিয়ায়। আরব আমিরাত, ভারত কিংবা বাংলাদেশে নয়। অস্ট্রেলিয়ার তুলনামূলক দ্রুতগতির উইকেটে একটু বেশি বাউন্স আর একটু-আধটু সুইংয়ের মিশেলে গড়া পিচে প্রোটিয়াদের হারানোর জন্য যতটা সমৃদ্ধ, পরিণত, দক্ষ এবং পরিপাটি ব্যাটিং ও ধারালো বোলিং প্রয়োজন, তা নেই বাংলাদেশের। কাজেই দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠা কঠিনই হবে।
তবে টাইগার ভক্ত ও সমর্থকদের সচেতন অংশের ধারণা এবার দুটি ম্যাচ জিততে পারে বাংলাদেশ। এক নেদারল্যান্ডস। দুই জিম্বাবুয়ে। প্রথম পর্ব থেকে উঠে আসা এই দল দুটির সঙ্গে সেরা বারোর লড়াইয়ে গ্রুপ-২ এ বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত, পাকিস্তান আর দক্ষিণ আফ্রিকাও। কাজেই এই দল তিনটির সঙ্গে জেতা কঠিন হবে ধরে ভাবা হচ্ছে নেদারল্যান্ডস আর জিম্বাবুয়েকে হয়তো হারাতে পারবে বাংলাদেশ।
সত্যিই নেদারল্যান্ডস ও জিম্বাবুয়ের সঙ্গে পারবে সাকিবের দল? ইতিহাস-পরিসংখ্যান কী বলে? সবার আগে সেটাই খুঁটিয়ে দেখা দরকার। ইতিহাস জানাচ্ছে, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে এর আগে বাংলাদেশ তিনবার নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয়েছে। যার দুটিতে জিতেছে । হেরেছে একবার।
প্রথম জয়টি নেদারল্যান্ডসের মাটিতে ২০১২ সালের ২৫ জুলাই। ডাচদের ১৪৪ রানে আটকে ৮ উইকেটে জয়ী হয় বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল খেলেন ৫৩ বলে ৬৯ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস। মুশফিকুর রহিম উপহার দেন ২৪ বলে ৩৭ রানের আর একটি হার না মানা ইনিংস।
এর পরের দিন, ২০১২ সালের ২৬ জুলাই নেদারল্যান্ডসের কাছে ১ উইকেটে হার মানে বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল ৪৬ বলে ৫০ আর মুশফিকুর রহিম ৩১ বলে ৪১ রানের দুটি ভালো ইনিংস খেললেও বাংলাদেশ আটকে যায় ১২৮ রানে। ডাচরা সে রান টপকে জয় তুলে নেয় শেষ বলে। এরপর ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ভারতের ধর্মশালায় বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে নেদারল্যান্ডসকে ৮ রানে হারায় বাংলাদেশ।

তামিম ইকবালের ৫৮ বলে ৮৩ রানের হার না মানা ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ পায় ১৫৩ রানের (৭ উইকেটে) মাঝারি পুঁজি। সাকিব (২/২৯) আর পেসার আল-আমিন হোসেনের (২/২৪) মাপা বোলিংয়ে ৮ রানের স্বস্তির জয় পায় বাংলাদেশ। এরপর আর নেদারল্যান্ডসের সাথে দেখা হয়নি বাংলাদেশের।
অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৯ বার মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশ জিতেছে ১২টিতে। জিম্বাবুয়ের জয় ৭টিতে। ২০১৯ থেকে ২০২২- এই তিন বছরে বাংলাদেশ তিনটি সিরিজ খেলেছে। যার প্রথম দুটিতে বাংলাদেশ জিতেছে। একবার দেশে (২-০) আর একবার জিম্বাবুয়ের মাটিতে (২-১); কিন্তু এ বছর জিম্বাবুয়ে গিয়ে উল্টো ১-২ ব্যবধানে হেরে এসেছে বাংলাদেশ।
এক কথায় বলা যায় সিকান্দার রাজার কাছেই ধরাশায়ী হয়েছে টাইগাররা। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে জেতে ১৭ রানে। দ্বিতীয় খেলায় ৭ উইকেটে জিতে বাংলাদেশ সিরিজে সমতা ফিরিয়ে এনেও পারেনি। শেষ ম্যাচে সিকান্দার রাজা শূন্য রানে আউট হলেও বাংলাদেশ হেরে যায় ১০ রানে।
অবশ্য ওই সিরিজে সাকিব খেলেননি। নুরুল হাসান সোহানও ইনজুরির কারণে শেষ ম্যাচ খেলতে পারেননি। কাজেই বলেই দেওয়া যায় বাংলাদেশ পুরো শক্তির দল নিয়ে মাঠে নামতে পারেনি। এখন দেখা যাক অধিনায়ক সাকিব ও উইকেটরক্ষক সোহান ফিরে আসায় এবার জিম্বাবুয়ের সাথে কি করে বাংলাদেশ?
দু’দলে আরও ভালো ভালো খেলোয়াড় আছেন। তবে জিম্বাবুয়ে আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বাংলাদেশের তুরুপের তাস সাকিব। তার বোলিং এবং ব্যাটিং দুটিই টিম বাংলাদেশের প্রধান সম্পদ, চালিকাশক্তি। সাকিব যদি ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বল হাতে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন, তাহলে ডাচ ও জিম্বাবুইয়ানদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে টাইগাররা।
এর বাইরে টপ অর্ডারদের কার্যকরিতা এবং বোলারদের বিশেষ করে ‘ডেথ’ ওভারের মাপা ও নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে বাংলাদেশের। ওপেনিং একদম ভালো হচ্ছে না। পাওয়ার প্লে‘র প্রথম ৬ ওভারে এগিয়ে যাওযার বদলে মুখ থুবড়ে পড়ে উল্টো ম্যাচ হাতছাড়া করছে সাকিবের দল।

সে অচলাবস্থার অবসান অতি জরুরি। যে করেই হোক শুরুতে ব্যাকফুটে যাওয়া যাবে না। তাতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাবে। পরের দিকে সাকিব-আফিফ আর সোহান ছাড়া হাল ধরার কেউ নেই। আর বোলিংটা আরও সাজানো, পরিপাটি এবং মিতব্যয়ী হওয়া খুব জরুরি।
তাসকিন, মোস্তাফিজ (যদি খেলেন) আর শরিফুলদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং খুব বেশি দরকার। এ কাজগুলো ঠিকমতো হলে নেদারল্যান্ডস আর জিম্বাবুয়েকে হারানো অসম্ভব নয়; কিন্তু এর অন্যথা হলে চলবে না। এর বাইরে উইকেটের ভূমিকাও থাকবে।
যে দুই মাঠে নেদারল্যান্ডস আর জিম্বাবুয়ের সাথে খেলা, সেই হোবার্ট আর ব্রিসবেনের উইকেট ‘টিপিক্যাল’ অস্ট্রেলিয়ান পিচ হলে বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক। উইকেট একটু স্লো ও স্পিন সহায়ক হলে বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই ভালো। তখন সাকিব, মিরাজের ভালো করার অনুকূল প্রেক্ষাপট তৈরি হবে।
সঙ্গে বাড়তি স্পিনার হিসেবে নাসুমকেও খেলানো যাবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ডাচ ও জিম্বাবুয়ানদের বধ করতে হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো স্পিন বোলিং। এখন সেই স্পিনাররা যদি ভালো করার ক্ষেত্র পান, সেটা অবশ্যই প্লাস। আর তার উল্টোটা হলে হবে মাইনাস।
এআরবি/আইএইচএস