রাজিন সালেহ’র সাক্ষাৎকার
‘সারাজীবনের স্বপ্ন, সিলেটের হয়ে কিছু করবো’
বিপিএলে প্রথমবার হেড কোচ হয়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজিন সালেহ আলম। সাবেক এই ক্রিকেটারের দারুণ ক্যারিশম্যাটিক পরিকল্পনায় অসাধারণ একটি দল হয়ে উঠেছে সিলেট স্ট্রাইকার্স। অধিনায়ক মাশরাফির অবদান অস্বীকার করা সুযোগ নেই। তবে নেপথ্যের কারিগর হিসেবে তো রাজিন সালেহই মূল ব্যক্তি।
সিলেটের মানুষ, জাতীয় দলে খেললেও সিলেটের টান তার মধ্যে অনেক বেশি। খেলোয়াড়ি জীবন শুরুর পর থেকেই তার মধ্যে চিন্তা থাকতো, ভবিষ্যতে সিলেটের জন্য কিছু করবেন। সিলেটে ক্রিকেটের উন্নয়নে অবদান রাখবেন।
আজ তার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। বিপিএলে হেড কোচের দায়িত্ব পেয়েছেন নিজের এলাকার ফ্র্যাঞ্চাইজি সিলেট স্ট্রাইকার্সের। শুধু তাই নয় মেধা, যোগ্যতা, পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনা- একটি দলকে কোথায় নিতে পারে তার উদাহরণ সিলেট স্ট্রাইকার্স। বড় কোনো তারকা নেই। সবাই বলতে গেলে মিডিওকার। কিন্তু এই সবাইকে একটি দলে পরিণত করেছেন রাজিন সালেহ।
দেশের হয়ে ২৪টি টেস্ট খেলে কোনো সেঞ্চুরি নেই। তবে ৪৩টি একদিনের ম্যাচে কেনিয়ার বিপক্ষে (২০০৬ সালের ২৫ মার্চ ফতুল্লায় ১০৮*) একটি শতরান আছে সিলেটের এ মিডল অর্ডার কাম অফস্পিনারের।
২০১৮ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করেই কোচিংয়ে যোগ দেন। প্রথম বছর কোচিং শুরু করেই দেড়যুগ পর সিলেটকে জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়ন করানোর কৃতিত্ব আছে রাজিনের।
রাজিন সালেহর সঙ্গে কথা বলেন জাগো নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা আরিফুর রহমান বাবু। সেই সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশে ছিল কীভাবে তিনি সিলেট স্ট্রাইকার্সের কোচ হলেন, সেখানে মাশরাফি বিন মর্তুজার কী ভূমিকা ছিল- সে সব বিষয়। আজ দ্বিতীয় এবং শেষ পর্বে থাকছে সিলেট স্ট্রাইকার্সের নানা বিষয়াদি এবং সিলেট নিয়ে রাজিন সালেহর স্বপ্নের কথা।

এক ঝলকে পড়ে নিন রাজিন সালেহর সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব।
জাগো নিউজ: নিজ জেলা ও বিভাগ সিলেট। কাকতালীয়ভাবে সেই সিলেটকে নিয়েই শুরু হলো আনুষ্ঠানিকভাবে হেড কোচের যাত্রা। কীভাবে দেখেন ব্যাপারটা?
রাজিন সালেহ: এ এক অন্যরকম ভালোলাগা। আমি খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, সিলেটের হয়ে কিছু করার। কোচ, মেন্টর যে পদেই থাকি না কেন, সিলেটের ক্রিকেট উন্নয়নে ভূমিকা রাখার স্বপ্ন আমার বহুদিনের। আল্লাহ রাহমানুর রাহিম সে স্বপ্ন পূর্ণ করেছেন আসলে ২০১৮ সালেই। আমি জাতীয় লিগে সে বছরই সিলেটের দায়িত্ব নেই। সেবারই প্রায় দেড়যুগ পর সিলেট চ্যাম্পিয়ন হয়। এবার সিলেটের হয়ে বিপিএলে কাজ করতে পেরে আমি খুব খুশি। মালিক পক্ষ এবং মাশরাফি আমাকে সে সুযোগটা দিয়েছে। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমি এখনো শিখছি।
জাগো নিউজ: তারপরও মাঠে আপনার দল এতটা ভালো খেলবে, শেষ পর্বের আগে পর্যন্ত সবার ওপর থাকবে, এতটা ভেবেছিলেন?
রাজিন: এখন পর্যন্ত এক নম্বরে থাকবো, এতটা ভাবিনি। ভালো খেলবো, ভালো ফলের চেষ্টা করবো এমন আশা ছিল। কিন্তু মাঠের পরফরম্যান্স এতটা উজ্জ্বল হবে। এতটা ভালো হবে তা ভাবিনি। ছেলেরা ব্যতিক্রমি ভালো খেলে আমাদের এতটা পথ এগিয়ে দিয়েছে।
জাগো নিউজ: এতটা ভালো খেলা ও এতদূর আসার পেছনের গল্পটা একটু বলুন? কি করে সম্ভব হলো?
রাজিন: আগেই বলেছি আসর শুরুর আগে বিকেএসপিতে আমরা নিজেরা একটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলি। সেই ম্যাচে আমাদের ব্যাটারদের ব্যাটিং দেখেই আমার মনে হচ্ছিল আমরা ভালো খেলবো এবং এই দল নিয়ে ভালো করা সম্ভব। তারপরও বলতে দ্বিধা নেই যে পারফরম্যান্স এতটা উজ্জ্বল হবে আর আমরা এখন পর্যন্ত সবার ওপরে থাকবো তা ভাবিনি।
আসর শুরুর পর চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের সাথে প্রথম ম্যাচ খুব সহজে জিতে যাই। দ্বিতীয় ম্যাচটিই ছিল বরিশালের সাথে। সেই খেলায় ১৯২ না ১৯৪ রান চেজ করে জিতলাম। তখন একটা অন্যরকম আস্থা, আত্মবিশ্বাস জন্মালো। মনে হলো অনেক দূর যাওয়া সম্ভব। তখন থেকেই আমরা সামনে আগানোর জোর চেষ্টা চালাই।
জাগো নিউজ: দলের এই অগ্রযাত্রায় কোচ রাজিনের ভূমিকা কী?
রাজিন: আমি ওয়ান টু ওয়ান কাজ করতে খুব পছন্দ করি। প্লেয়ারদের সাথে এক এক করে কথা বলতে পছন্দ করি। তাদের কার কি সমস্যা, জানতে চাই। এখানেও তা করার চেষ্টা ছিল। এছাড়া স্পেশালিস্ট কোচ সৈয়দ রাসেল, তুষার ইমরান আর নাজমুল- সবার সাথে আলাদা কথা বলে তাদেরও কাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করে দেই। কে কি করলো, কার রোল কি হবে? এসব বলে দেই।
কে কোন পজিশনে খেলতে চায়, কে কোথায় কখন বোলিং করতে চায়? স্পেশালিস্ট কোচদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ক্রিকেটারদের সাথে কথা বার্তা বলে তা ঠিক করতে। এভাবে করে দল হিসেবে কাজ করেছি। এই ছোট ছোট কাজগুলোই ম্যাচে আমাদের কাজে দিচ্ছে।
জাগো নিউজ: অধিনায়ক মাশরাফি আর তরুণ ক্রিকেটারদের কথাতো বললেন, হেড কোচ রাজিন সালেহর কথাতো বললেন না। কোন মন্ত্রে হেড কোচ রাজিন এবার একটা সফল? একটু বলবেন?
রাজিন: হা. হা.. হা... (জোরে হেসে উঠে)। আসলে আমি শুরু থেকেই দলকে কম্বাইন্ড করতে চেয়েছি। বলতে পারেন, সেটাই ছিল আমার মূলমন্ত্র। আমি খুব ভাল করেই জানি একটা টিমকে এক করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভাল খেলার পূর্বশর্তই হলো একতা। সংহতি। তাই আমি প্রথমেই দলটাকে কম্বাইন্ড করার চেষ্টা করেছি যে, দলটি একসাথে খেলবে, সবাই পারফর্ম করবে। কমবেশী অবদান রাখবে। আমি চেয়েছি এটা নিশ্চিত করতে।
কোচ হিসেবে আমার টর্গেট ছিল সবার কাছ থেকে কন্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করা। আমি সে চেষ্টা করেছি। তবে আমার মনে হয় আমার কাজ অনেকটাই কমিয়ে ও সহজ করে দিয়েছে মাশরাফি। বলতে পারেন প্রশিক্ষকের অর্ধেক কাজ করে দিয়েছে অধিনায়ক মাশরাফি। দলকে কিভাবে এক করতে হয়? কিভাবে চালাতে হয়? সেই কাজগুলো মাশরাফি অনেক ভাল জানে। খুব ভালভাবে পারে। পেরেছেও।
সঙ্গে মুশফিকও খুব যত্ম নিয়ে আন্তরিকতার সাথে নিজ দায়িত্ব যতটা সম্ভব ভালভাবে পালনের পাশাপাশি তরুণদের গাইডে সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। এছাড়া আমার মনে হয়, যে যে জায়গায় যেমন কাজ করা দরকার, সেই জায়গায় সঠিক কাজ করতে পেরেছি আমরা। প্লেয়ারদের কাছ থেকে দরকারের মুহূর্তে কার্যকর পারফরমেন্স আদায় করতে পেরেছি।
জাগো নিউজ: সিলেট স্ট্রাইকার্সের কোন কোন পারফরমার আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছেন?
রাজিন: শান্ত, তৌহিদ হৃদয়, জাকির হাসান, মুশফিক, রেজাউর রহমান রাজা, তানজিম সাকিব সবাই নজর কেড়েছে। দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বলতে পারেন যার কাছে যা চেয়েছি আমরা তা পেয়েছি। শান্তকে নিয়ে অনেক কথা হয়; কিন্তু আমি জানি শান্ত অনেক ভাল প্লেয়ার। আর তার সাথে আমার বোঝাপড়াও চমৎকার।
আমি এর আগে রাজশাহী মিনিস্টারে ব্যাটিং কোচের দায়িত্বে ছিলাম। সে বার বিপিএলে শান্ত সেঞ্চুরি করে আমার দিকে ব্যাট দেখিয়েছিল। তার প্রতি আস্থা ছিল। মাঠেও শান্ত আস্থার প্রতিদান দিয়েছে। আর তৌহিদ হৃদয় ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলছে। জাকিরও তাই। পারফরমেন্স আদায় করাটা খুব জরুরি। আমরা তা পেরেছি। আমি সন্তুষ্ট।
জাগো নিউজ: আপনার নিজের ও দলের এখন লক্ষ্য কি?
রাজিন: আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল প্রথম ৪ দলের ভিতরে থাকা এবং এখন টার্গেট শীর্ষ দুইয়ের ভিতর জায়গা করে নেয়া। এক বা দুইয়ে থাকা টার্গেট। যদিও আমরা দুই ম্যাচ খেলতে চাই না। একম্যাচ জিতেই ফাইনালে চলে যেতে চাই। তারপরও কোয়ালিফায়ার খেলতে পারলে বাড়তি অপশন থেকে যায়। আমরা তাই কোয়ালিফায়ার খেলতে এক কিংবা দুইয়ে থাকাই লক্ষ্য আমাদের।
জাগো নিউজ: মাশরাফি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলেন না ৬ বছর। মাঝে ৮ মাস প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেরও বাইরে ছিলেন। আর মুশফিকও এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে ছিলেন না। এ দুজনকে ছন্দে ফেরাতে আপনার ভূমিকা কি ছিল? নাকি তারা নিজেরাই অনুপ্রাণিত হয়েছেন?
রাজিন: মনে হয় তারা নিজেরাই নিজেদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না। প্রথমে মুশফিক টিমকে বলতেছিল, ‘আমি এ ধরনের টিম পছন্দ করি যে দলে কমেন্ট করবেন একজন। শুনবেন সবাই। মুশফিকের ইনভলব ছিল। মাশরাফিতো ছিলই। মুশফিকও অনেক অবদান রেখেছে।’
মাশরাফি গ্রেট লিডার। সে জানে টিমকে কিভাবে চালাতে হয়। ইনজুরির কারণে হয়তো ফিটনেস কম, তারপরও মাশরাফি সেটাকে অতিক্রম করেছে নিজের পেশাগত সততায়। তার একাগ্রতা, আন্তরিকতা ও চেষ্টা অসাধারণ। সে জানে প্র্যাকটিস কম করেও সামর্থ্যের শতভাগের বেশী দিয়ে সে ঘাটতি পুষিয়ে দেয়। সে জানে মাঠে ও মাঠের বাইরে দলকে কিভাবে এক সুতোয় গেঁথে রাখার পাশাপাশি চাঙ্গা রাখতে হয়। ভাল খেলতে উজ্জীবিত রাখতে ও অনুপ্রাণিত করতে হয়। আমার মনে হয় মাশরাফি শুধু আমাদের দেশেরই না, বিশ্বেরও সেরা অন্যতম সেরা লিডার। তার সে যোগ্যতা আছে।
জাগো নিউজ: আপনার দলের সব কোচিং স্টাফই বাংলাদেশের। এই স্থানীয় কোচিং স্টাফ নিয়ে কি বিপিএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব?
রাজিন: আমি জানি না আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারবো কি না, ফাইনাল খেলতে পারবো কি না? তবে আমি মনে করি আমাদের যে কোচিং স্টাফ আছে, তা দিয়ে অবশ্যই বিপিএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব।
আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের দেশের দুই সিনিয়র ও নামী কোচ সালাউদ্দীন ভাই (মোহাম্মদ সালাউদ্দীন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কোচ) ও খালেদ মাহমুদ সুজন ভাই (খুলনা টাইগার্সের কোচ) বিপিএলে সবচেয়ে সফল প্রশিক্ষক। বেশিরভাগ চ্যাম্পিয়ন দলের কোচই তারা দুজন। লোকাল কোচদের নিয়ে কাজ করলে অবশ্যই অনেক ভাল ফল করা সম্ভব।
তবে আমি একটি কথা বলতে চাই, লোকাল কোচদের স্বাধীনতা দিতে হবে। তাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখাটাও খুব জরুরি। তবেই স্থানীয় কোচরাও সেরা সাফল্য উপহার দিতে পারবেন।
এআরবি/আইএইচএস