ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন আন্দোলনরত মোবাইল ব্যবসায়ীরা: এমআইওবি
ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা বন্ধের দাবিতে আন্দোলনরত মোবাইল ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)। সংগঠনটির দাবি, আন্দোলনকারীদের উপস্থাপিত অধিকাংশ তথ্যই ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
এমআইওবি বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও দুর্নীতির মাধ্যমে এনইআইআর প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা পক্ষের হাত ধরে আবারও প্রকল্পটি বন্ধ হতে পারে। সংগঠনটির দাবি, এনইআইআর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, এটি দেশের স্বার্থেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে এমআইওবি। ‘এনইআইআর-এর হাত ধরে শুরু হোক নিরাপদ বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত মোবাইল ব্যবসায়ীদের নানা সমালোচনা করে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এমআইওবি সদস্য ও শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড জিয়াউদ্দিন চৌধুরি বলেন, আন্দোলনরত ব্যবসায়ীরা ২০ হাজার দোকানের কথা বলছেন, যা সম্পূর্ণ ভুয়া। যারা আন্দোলন করছেন তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই রিটেইলার এবং তারা আমাদের মোবাইল বিক্রি করেন। প্রকৃতপক্ষে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার দোকানি পুরোপুরি ক্লোন বা অবৈধ ফোন বিক্রির সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ‘আন-অফিশিয়াল সেট’ বলে পৃথিবীতে কোনো কিছু নেই এবং ব্যবসায়ীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি— এ অভিযোগও সঠিক নয়।আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন এনইআইআর চালু হলে ব্যবহৃত (ইউজড) মোবাইল ফোনের বাজার থাকবে না— এটি সম্পূর্ণ ভুল। বাস্তবে ইউজড ফোন পরিবর্তনের ব্যবস্থা সবার আগে এনইআইআর ব্যবস্থার মাধ্যমেই চালু করা হয়েছে।
নিজেদের ‘মোবাইল সিন্ডিকেট’ আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, তারা বৈধভাবে মোবাইল উৎপাদন ও সঠিক প্রক্রিয়ায় আমদানি করেন বলেই নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন, যা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তিনি বলেন, তারা সবসময় বৈধ ব্যবস্থাকেই সমর্থন করবেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিদিনই পারস্পরিক প্রতিযোগিতা হয়, ফলে তাদের মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কোনো সুযোগ নেই।
এনইআইআর চালু করতে বিটিআরসিকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এমআইওবি’র সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, বিটিআরসির আরও দুটি প্রকল্পেও একই ধরনের প্রাইভেট–পাবলিক পার্টনারশিপের নজির রয়েছে, যাতে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যায়। তিনি জানান, এমআইওবি কেবল বায়োমেট্রিক সিস্টেম, সিস্টেম আপগ্রেডেশন ও লাইসেন্স ফি বাবদ খরচ বহন করেছে। এটি প্রথম কোনো প্রকল্প নয় যেখানে এ ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে। আগের রেফারেন্স দেখে বিটিআরসি তাদের কাছে সহায়তা চেয়েছিল এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে সেই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি আরও বলেন, ‘অবৈধ কার্যক্রমকে বাধা দেওয়াকে বৈষম্য হিসেবে দেখানো উচিত নয়। বরং যারা বৈধভাবে ব্যবসা করছেন, তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দেশে ও ন্যায়ের স্বার্থে মোবাইল ব্যবসায়ীদের ইগো ত্যাগ করতে হয়। ইম্পোর্টে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, সুতরাং এখানে কোনো বৈষম্য নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ফোন ও মেমোরির দাম বেড়েছে; এনইআইআর চালু হওয়ার কারণে দাম বেড়েছে বলে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আন্দোলনকারীরা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। আমরা কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নই।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘২০২১ সালে এই প্রকল্প চালু হয়েছিল, কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে তা বন্ধ করা হয়েছিল। এখন আন্দোলনকারীরা প্রকল্পটি থামিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের ধারণা, রাজনৈতিক সরকার এলে দুর্নীতির মাধ্যমে এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু এনইআইআর দেশের স্বার্থে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির স্বার্থে নয়।’
এদিকে, সংগঠনটি বলছে দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে স্বচ্ছতা জোরদার, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এনইআইআর বাস্তবায়ন হতে হবে। এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানায় সংগঠনটি।
এমআইওবি জানায়, সরকার ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও ইতিবাচক।
সংগঠনটির মতে, এসব নীতিগত উদ্যোগ মোবাইল ফোন শিল্পে দীর্ঘদিনের অনিয়ম কমাতে এবং একটি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
এমআইওবির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৮টি স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এই খাতে সরাসরি ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি ডিলার, ডিএসআর, সার্ভিস ও খুচরা বিক্রয়সহ আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক সক্রিয়ভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে এই শিল্প থেকে সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল আয় করছে।
এমআইওবি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানায়, এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কিছু অবৈধ স্মার্টফোন ব্যবসায়ীর সহিংস ও বিশৃঙ্খল কর্মকা- অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় একটি সীমিত গোষ্ঠী-যারা দেশের প্রায় ১২ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার, স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের দাবি মেনে নেওয়ার পরও বেআইনি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে।
এমআইওবি জানায়, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বহিরাগতদের এনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বিটিআরসি কার্যালয়ে ভাঙচুর, শিশুদের ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈধ মোবাইল ফোনের দোকান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, ‘এনইআইআর বাস্তবায়ন দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে অবৈধ ও নকল মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বিটিআরসি কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরসহ যে কোনো সহিংস ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকলে স্মার্টফোন শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি।’
সংবাদ সম্মেলনে এডিসন ইন্ডাস্ট্রিজের (সিম্ফনি ব্র্যান্ড) এমডি জাকারিয়া শাহিদ, শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, স্মার্ট হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের (অনার ব্র্যান্ড) এমডি জহিরুল ইসলাম, এক্সেল টেকনোলজিসের (স্যামসাং ব্র্যান্ড) অ্যাক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সাইফুদ্দিন টিপু, গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশনের এমডি জহুরুল হক এবং ভিভোর প্রতিনিধি ইমাম উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ইএইচটি/এমএএইচ/এমএস