৬০০ বছরের সাক্ষী মানিকগঞ্জের মাচাইন শাহী মসজিদ
প্রাচীন মাচাইন শাহী মসজিদ, ছবি: জাগো নিউজ
সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে কত সাম্রাজ্য, বদলে গেছে নদী ও জনপদের গতিপথ। কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন মাচাইন শাহী মসজিদ। প্রাচীনতম মসজিদটি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার মাচাইন গ্রামে অবস্থিত।
চুন, সুরকি ও সাদা সিমেন্টে নির্মিত মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকলেও সঠিক সংরক্ষণ ও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে এর শৈল্পিক কারুকাজ ক্রমেই মলিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই সম্পদ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জানা যায়, ১৫০১ খ্রিষ্টাব্দের শেষভাগে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনামলকে বাংলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাচাইন শাহী মসজিদ সেই সময়ের স্থাপত্য নৈপুণ্যেরই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
মসজিদটির মূল কাঠামোর ওপর আছে তিনটি গম্বুজ—মাঝেরটি তুলনামূলক বড়, দুই পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট দুটি গম্বুজ। এ বিন্যাস স্থাপনাটিকে দিয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভারসাম্য। প্রতিটি গম্বুজের নিচে আছে সূক্ষ্ম খাঁজকাটা অলংকরণ। দেওয়ালজুড়ে কারুকাজ, নকশা ও গঠনশৈলীতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সুলতানি শিল্পরুচির ছাপ। পূর্বমুখী প্রবেশদ্বার ও পশ্চিম প্রাচীরে মেহরাবের নান্দনিক বিন্যাস ধর্মীয় স্থাপত্যরীতির ঐতিহ্য বহন করে। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি ইতিহাস ও শিল্প দুইয়েরই সমন্বিত প্রকাশ।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইসলাম প্রচারের জন্য হজরত শাহ জালালের (রহ.) নেতৃত্বে ৩৬০ আউলিয়া বাংলায় আগমন করেন। তাঁদের অন্যতম ছিলেন শাহ রুস্তম বোগদাদী (রহ.)। তৎকালে এ অঞ্চল ছিল নদীপথনির্ভর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। চারদিকে নদীঘেরা পরিবেশে শাহ রুস্তম (রহ.) বাঁশের একটি মাচা তৈরি করে ইবাদত ও সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। একদিন মাঝনদীতে তাঁর ইবাদতরত অবস্থা দেখে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নৌযাত্রা স্থগিত করে সাক্ষাৎ করেন। শাহ রুস্তমের (রহ.) ধর্মপ্রচার ও আধ্যাত্মিক প্রভাব দেখে মুগ্ধ হয়ে সুলতান তাঁর নামানুসারেই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন।
নদীর মাঝখানে বাঁশের ‘মাচা’ নির্মাণ করে ইবাদত করার ঘটনাই পরে এলাকার নামকরণে প্রভাব ফেলে। ‘মাচা’ শব্দ থেকেই ‘মাচাইন’ নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। শাহ রুস্তমের (রহ.) আগমনের পর এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার, খানকা প্রতিষ্ঠা এবং ধীরে ধীরে বসতি গড়ে ওঠে। জলপথনির্ভর বাণিজ্য ও যোগাযোগের কারণে এলাকাটি গুরুত্ব লাভ করে এবং সময়ের সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদে পরিণত হয়।
মাচাইন শাহী মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ। দু’পাশের গম্বুজ দুটি তুলনামূলকভাবে ছোট আর মাঝখানের গম্বুজটি বড় ও দৃষ্টিনন্দন। মসজিদটিতে মোট চারটি দরজা আছে। পরে মূল মসজিদের গা ঘেঁষে আরও একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে প্রাচীন মসজিদটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। দেওয়ালের কিছু অংশে ক্ষয় ও স্যাঁতসেঁতে ভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়া সূক্ষ্ম কারুকাজের নান্দনিক অংশগুলোও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মাচাইন গ্রামের কাজী জুয়েল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বাবা-দাদারা যে গল্প এই মসজিদ নিয়ে শুনে গেছেন; আমরাও একই গল্প শুনেছি। মসজিদটি ৬০০-৭০০ বছরের পুরোনো। এখানে আগে নদী ছিল। তখন এলাকায় এক সওদাগরের জাহাজ নষ্ট হয়ে যায়। পরে তারা দেখতে পান, নদীর মাঝে এক জায়গায় অল্প কিছু আলো জ্বলে। তারা আলোর দিকে এগিয়ে এলে দেখেন, মাঝ নদীতে মাচার ওপর বসে একজন ধ্যান করছেন। তখন সওদাগর বলেন, আমার জাহাজ নষ্ট হয়ে গেছে। তখন সওদাগরকে লোকটি বলেন, চলে যা। যেতে পারবি।’

একই গ্রামের প্রবীণ কাজী অখিল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ছোট সময় থেকেই শুনেছি এটা একটা গায়েবি মসজিদ। আমরা শুনেছি শাহ আমলে মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে। মসজিদটির পাশেই একটি মাজার শরীফ আছে। শাহ রুস্তম (রহ.) মাজার শরীফ ঘিরেই মসজিদটি তৈরি হয়েছে।’
মাচাইন শাহী মসজিদের ইমাম ও খতিব আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের মসজিদটি ছয়শ বছরের পুরাতন হওয়ায় চুন এবং সুরকি খুলে খুলে পড়ছে। মসজিদটি সংস্কার করে ইতিহাস রক্ষা করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।’
যেভাবে যাবেন
জেলা সদর থেকে বেওথা ব্রিজ অতিক্রম করে ঝিটকা ঐতিহ্যবাহী হাট হয়ে পোদ্দার বাড়ির মোড় দিয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় মাচাইন গ্রামে। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক হয়ে মহাদেবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা দিয়েও যাওয়া সম্ভব মাচাইন শাহী মসজিদে।
এসইউ