প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কেন সামাজিক জড়তা?

জাহাঙ্গীর আলম প্রকাশিত: ০৭:০০ পিএম, ০৮ জুলাই ২০১৯
প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কেন সামাজিক জড়তা?

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। তাদের শিক্ষা, জীবন-দক্ষতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করছে আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে মানুষের শরীর ও মনে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। যৌবনে এসে এসব পরিবর্তন পূর্ণতা লাভ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময়ে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়, তারা প্রজননক্ষম হয়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী পরিষ্কারভাবে জানে না তাদের প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কে, সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কেও তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। এ বিষয়ে জানতে আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো ‘সামাজিক জড়তা’। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে জনসচেতনতা বাড়বে এবং আমাদের আগামী প্রজন্ম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে দেশ গঠনে অবদান রাখতে পারবে।

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প ‘ছুটি’র প্রধান চরিত্র ফটিক সম্পর্কে বলা হয়েছিল ‘বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না, এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে’।

ফটিকের বয়সী কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার তরত বাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে তাদের বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কথা উঠতেই লজ্জা আর জড়তা এসে ভর করলো প্রত্যেকের চোখে মুখে। বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন নিয়ে তারা কী জানে?

এই ছেলে-মেয়েদের বয়স ১৩ থেকে ১৬’র মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত বয়ঃসন্ধিকাল, এ সময়টাতে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় ফলে তারা প্রজননক্ষম হয়।

কিন্তু এই বয়সী বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরী পরিষ্কারভাবে জানে না তাদের প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কে, আর সার্বিক প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাদের ধারণা যে নেই সেটা বলা বাহুল্য।

প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে না জানার ফলে কী সমস্যা হচ্ছে?

বাংলাদেশের সমাজে যুগ যুগ ধরে চলা সামাজিক জড়তার কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিজ্ঞানসম্মত কোনো জ্ঞান ছাড়াই পার করছেন। বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অব সেপটিক অ্যাবরশন, বাংলাদেশ (বাপসা) দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয়, প্রজনন অঙ্গ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সুস্থ্য ও সঠিক ধারণা থাকলে সেটা একটি কিশোর-কিশোরীর পরবর্তী মানসিক গঠনে সাহায্য করে।

সংস্থাটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামিমা আখতার চৌধুরী প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানান, অল্প বয়সী ছেলেরা গনোরিয়ায় ভুগছে, লজ্জায় বলতে পারে না। মেয়েরা প্রেগন্যান্ট হচ্ছে কিছু না বুঝেই। আবার অ্যাবরশন করাতে যেয়ে আরো বিপাকে পড়ছে।

সংকোচ কাটছে না পরিবারে

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। এদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখের উপরে।
একটি শিশু বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায় তখন সেই পরিবর্তনগুলো পরিবারে বাবা-মা বা নিকটজনের দৃষ্টিগোচর হয় সবার আগে। কিছু ক্ষেত্রে মায়েরা মেয়ে সন্তানের দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ না করলেও ছেলে সন্তানদের বেলায় সংকোচ কাটাতে পারেন না।

রাফিয়া মজুমদারের তিন সন্তান। ছোট ছেলের বয়ঃসন্ধিকাল এখন। তিনি বলেন, ছেলের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন খেয়াল করার পরেও তার সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। যার কারণে মা-ছেলের সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে দিন দিন।

তিনি বলেন, আমার ছোট ছেলে ঢাকার এক স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এর গোঁফ উঠছে, সবসময় মেজাজ খারাপ থাকে, আমি পরিবর্তনটা ধরতে পারছি কিন্তু লজ্জা কাটিয়ে বলতে পারছি না, সে আমাকে ভুল বুঝছে, বলছে আমি আগের মতো তাকে ভালোবাসি না।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, আইইএম ইউনিটের পরিচালক, লাইন ডাইরেক্টর আইইসি আশরাফুন্নেসা বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক জড়তা দূর করতে আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। এসব আলোচনাকে নেতিবাচক না ভেবে ইতিবাচক ভেবে অভিভাবকরা যদি সন্তানদের সঙ্গে একটু খোলামেলা আলোচনা করে তাহলেই আর কোনো জড়তা থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, শিশু-কিশোররা লজ্জা পেতে পারে কিন্তু বাবা-মায়েরা যেন এক্ষেত্রে লাজুক না হয়। সন্তানদের সুস্বাস্থ্য নির্মাণে তারা যেন পিছপা না হয়।

জেএ/এসএইচএস/এমএস

সর্বশেষ - নারী ও শিশু

জাগো নিউজে সর্বশেষ

জাগো নিউজে জনপ্রিয়