আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে তুরস্কের এত আগ্রহ কেন?

আধুনিক তুরস্ক এবং তার পূর্বসূরি অটোমান সাম্রাজ্যের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা শতাব্দী প্রাচীন। দীর্ঘ কয়েক দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে আঙ্কারার সক্রিয়তা আবারও বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ‘নব্য-অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতি এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় বন্ধন তুরস্ককে আবারও এই উপমহাদেশের রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক করে তুলছে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সামরিক সমীকরণ

২০২৫ সালটি দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ভূমিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারতের দাবি, গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষের সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে সরাসরি পাশে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ভারতীয় তদন্তকারীরা জনৈক তুর্কি হ্যান্ডলারের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন>>মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের নতুন উত্থান, আলোচনায় এরদোয়ানট্রাম্পের সঙ্গে আরব-মুসলিম নেতাদের বৈঠক ‘ফলপ্রসূ’ হয়েছে: এরদোয়ানএবার সাবমেরিন বানাচ্ছে তুরস্ক, নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় জোর

অন্যদিকে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আজারবাইজান মিলে গঠিত ‘থ্রি ব্রাদার্স’ বা ‘তিন ভাই’ প্রতিরক্ষা জোট এই অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতিকে শক্তিশালী করেছে।

ইতিহাসের পাতা থেকে: মুঘল ও অটোমান সংযোগ

তুরস্ক ও দক্ষিণ এশিয়ার এই গভীর সম্পর্কের মূল রয়েছে গত পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাসে। ইতিহাসবিদদের মতে, দিল্লিতে সুলতানি শাসন থেকে শুরু করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা—সবখানেই তুর্কি বংশোদ্ভূতদের আধিপত্য ছিল। বিশেষ করে, ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর যখন ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেন, সেই যুদ্ধে তিনি অটোমান প্রযুক্তির কামান এবং বন্দুক ব্যবহার করেছিলেন।

ষোড়শ শতকে পর্তুগিজদের সামুদ্রিক আধিপত্য এবং পারস্যের সাফাভি সাম্রাজ্যের বিস্তার রোধে মোগল ও অটোমানরা প্রায়ই কৌশলগত সহযোগিতা করতো। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে অটোমান খিলাফত রক্ষায় ভারতীয় মুসলমানদের ‘খিলাফত আন্দোলন’ দুই অঞ্চলের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংহতির চূড়ান্ত উদাহরণ হয়ে আছে।

এরদোয়ানের ‘নব্য-অটোমান’ দৃষ্টিভঙ্গি

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের শাসনামলে তুরস্ক নিজেকে মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তিনি অটোমান ও মোগল সাম্রাজ্যের পতনকে একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেন এবং তা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন লালন করেন। এই আদর্শিক মিলের কারণেই পাকিস্তান বর্তমানে তুরস্কের অন্যতম প্রধান মিত্র। পাকিস্তানে তুর্কি নাটক ও সংস্কৃতির ব্যাপক জনপ্রিয়তা এই ‘সফট পাওয়ারের’ প্রভাবকেই তুলে ধরে।

ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ

বিশেষজ্ঞরা তুরস্কের এই আগ্রহের পেছনে দুটি মূল কারণ দেখছেন:১. দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।২. পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করে তুরস্ক একদিকে যেমন তার অস্ত্র শিল্পের বাজার তৈরি করছে, অন্যদিকে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে চাপে রাখার কৌশল নিচ্ছে।

তবে তুরস্কের এই ‘পাকিস্তান-ঘেঁষা’ নীতি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের প্রকাশ্য পাকিস্তান সমর্থন এবং ভারতের সঙ্গে গ্রিস ও আর্মেনিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা আঙ্কারা ও দিল্লির মধ্যকার বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে সীমিত করে ফেলেছে।

ইতিহাসের আবর্তন মেনে একুশ শতকেও ধর্ম ও ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রভাব বলয় আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

(দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত অখিলেশ পিল্লালামারির বিশ্লেষণ অবলম্বনে)কেএএ/