জাতীয়

কনকনে শীতে বাতাস যেন সুঁইয়ের ফলার মতো বিঁধছে

পঞ্চাশোর্ধ রিকশাচালক হেকমত আলী। রোববার (৪ ডিসেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের সামনের ফুটপাতে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এক যাত্রী গুলিস্তান যাবেন কি না জিজ্ঞাসা করতে মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে না সূচক জবাব দিলেন। এবার যাত্রীর প্রশ্ন- যাবেন না কেন? ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিলেন তিনি। উত্তরে হেকমত নিচু স্বরে বলেন, ‘শীতে হাত-পা জমে গেছে। ঠান্ডা বাতাস শরীরে সুঁইয়ের ফলার মতো খোঁচা লাগছে। আগে জানডা বাঁচাই।’

দুজনের এই কথোপকথনে পৌষের শেষ ভাগে এসে হাড়কাঁপানো শীতের তীব্রতার প্রভাব সহজেই অনুমান করা যায়। বর্তমানে রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপনে ছন্দপতন ঘটেছে। থমকে গেছে নগরের স্বাভাবিক চঞ্চলতা। রাস্তাঘাটে লোকজনের উপস্থিতি অপেক্ষাকৃত কম। সকালের দিকে ও সন্ধ্যার পর খুব বেশি প্রয়োজন না হলে মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না।

তীব্র শীত আর ঠান্ডা বাতাসের কারণে দিনমজুর, রিকশাচালক, ঠেলাগাড়িচালক, হকার ও ফুটপাতের বাসিন্দাসহ নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ২৪ ঘণ্টার (সকাল ৯ টা থেকে) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারাদেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

অধিদপ্তর আরও জানায়, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, মৌলভীবাজার ও অন্যান্য জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। কুয়াচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে সারাদেশের শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।

আজ বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কগুলোতে রিকশাচালকদের জীবন এখন সবচেয়ে কঠিন। তীব্র বাতাসের ঝাপটা সরাসরি তাদের বুকে এসে লাগছে। বাতাসের সেই তীক্ষ্ণ খোঁচা থেকে বাঁচতে অদ্ভুত সব কৌশল বেছে নিচ্ছেন তারা। অনেক চালককে দেখা গেছে রিকশার সামনের অংশে পাতলা প্লাস্টিক বা চাদর বেঁধে নিতে, যাতে বাতাস সরাসরি শরীরে না লাগে। এর আগে যাত্রীহীন অলস দুপুরে অনেক চালককে দেখা গেছে রিকশার হুড নামিয়ে আসনের ওপর গুটিসুটি মেরে চাদর মুড়ি দিয়ে একটু উষ্ণতা খুঁজে নিতে।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, ফুটপাত ও মোড়ে মোড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ও ভাসমান দোকানিরা জবুথবু হয়ে বসে আছেন। পাতলা চাদর কিংবা জীর্ণ সোয়েটার দিয়ে বাতাস ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা তাদের। শাহবাগ বা টিএসসির মতো এলাকাগুলোতে চা বিক্রেতা বা হকারদের একটু ওম পেতে খড়কুটো জ্বালানোর প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে। তাদের মতে, বাতাস এমনভাবে শরীরে ঢোকে যে হাড় পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।

তীব্র ঠান্ডার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিম্নবিত্তের আয়ে। কুয়াশা আর বাতাসের কারণে মানুষ ঘর থেকে কম বের হওয়ায় রিকশা ও ভ্যানচালকদের আয় কমেছে অর্ধেকের বেশি। ভ্যানে করে সবজি বা পণ্য সরবরাহকারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও করুণ। সাইকেল বা রিকশা চালানোর সময় বাতাসের গতি বেড়ে যাওয়ায় ঠান্ডার তীব্রতা কয়েক গুণ বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবুও পেটের তাগিদে তাদের নামতে হচ্ছে এই বৈরী আবহাওয়াতেই।

তীক্ষ্ণ ঠান্ডায় ঘরে ঘরে বাড়ছে সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, বাতাসের এই সুঁইয়ের মতো খোঁচা থেকে বাঁচতে কান, নাক ও বুক ভালোভাবে ঢেকে রাখা জরুরি। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

এমইউ/একিউএফ/এমএস