ভ্রমণ

আর্জেন্টিনা ভ্রমণ: বরফের দেশে ফিরে দেখা

আর্জেন্টিনা ও প্যাটাগোনিয়ার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, গ্লেসিয়ারের অফুরন্ত মিঠা পানি, মানুষের সরল জীবন, ইতিহাসে মোড়া কলোনিয়া আর বিদায়ের মুহূর্তে জন্ম নেওয়া এক নীরব প্রতিশ্রুতি আবার ফিরে আসার। আর্জেন্টিনায় একটি দীর্ঘ ও গভীর অনুভূতিপূর্ণ ভ্রমণ শেষে টানা ২৬ দিন কাটিয়ে আমি যেন সময়ের এক ভিন্ন মাত্রা থেকে ফিরে এলাম। এই দিনগুলো শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় গোনা কিছু তারিখ নয়; এগুলো ছিল অনুভূতি, বিস্ময়, নীরবতা আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক বোঝার এক দীর্ঘ যাত্রা। আর্জেন্টিনা আমাকে শুধু ঘুরিয়ে দেখায়নি বরং ধীরে ধীরে আমাকে নিজের ভেতরে টেনে নিয়েছে তার বিস্তীর্ণ ভূমি, মানুষের সরলতা আর প্রকৃতির নির্ভার সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

এই ভ্রমণের সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম ও রহস্যময় অঞ্চল প্যাটাগোনিয়া। চিলি ও আর্জেন্টিনার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব কবিতা। এল কালাফোতে, এল চালতেন, পেরিতো মোরেনো এই নামগুলো শুধু জায়গার নাম নয়, এগুলো আমার কাছে এখন অনুভূতির নাম। এল কালাফোতের শান্ত শহর, এল চালতেনের পাহাড়ি পথ আর পেরিতো মোরেনোর বিশাল গ্লেসিয়ার সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

প্যাটাগোনিয়ার বাতাস আলাদা। এতে কোনো শহুরে ভার নেই, আছে মুক্তির স্বাদ। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সেই হাওয়া যেন মানুষের ভেতরের সব ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। এখানকার ভূমি রুক্ষ কিন্তু সেই রুক্ষতার মাঝেই আছে এক গভীর সৌন্দর্য। বিস্তীর্ণ প্রান্তর, বরফে ঢাকা পাহাড়, দূরে ঝুলে থাকা মেঘ সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, প্রকৃতি এখানে কোনো তাড়াহুড়ো জানে না। সে নিজের গতিতে চলে, নিজের নিয়মে বাঁচে।

প্যাটাগোনিয়ার গ্লেসিয়ারগুলো শুধু চোখের আরাম নয়, এগুলো মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়েও এক নীরব বার্তা বহন করে। বিশেষ করে সাউদার্ন প্যাটাগোনিয়ান আইস ফিল্ড; যা আর্জেন্টিনা ও চিলির সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির সংরক্ষণশালা হিসেবে বিবেচিত। অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের পরেই এর অবস্থান। কোটি কোটি বছর ধরে জমে থাকা এই বরফ শুধু অতীতের সাক্ষী নয়, ভবিষ্যতের আশ্বাসও।

পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ২.৫ থেকে ৩ শতাংশ মিঠা পানি। এর প্রায় ৭০ শতাংশই বরফ ও হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষিত। এই বাস্তবতায় প্যাটাগোনিয়ার গ্লেসিয়ারগুলো হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে গ্লেসিয়ার থেকে জন্ম নেওয়া লেকগুলোর পানি অফুরন্ত, স্বচ্ছ আর প্রাণভরা। এই লেকের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে একদিন যদি পৃথিবীতে পানির সংকট প্রকট হয়ে ওঠে, তবে এই অঞ্চলই হয়তো মানবজাতির জন্য এক স্বর্গীয় আশ্রয় হয়ে উঠবে। এখানকার বরফ গলে মানুষ পান করবে ফ্রেশ পানি, জীবন আবার নতুন করে পথ খুঁজে নেবে।

আরও পড়ুননীরব সৌন্দর্যের শহর স্ট্যানলি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিস্ময়কর ভ্রমণ 

এই অঞ্চলের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার মানুষ, তাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি সবকিছুই গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে আমাকে। প্যাটাগোনিয়ার মানুষগুলো প্রকৃতির মতোই সরল ও দৃঢ়। তারা কম কথা বলেন, কিন্তু তাদের চোখে আত্মবিশ্বাস আর শান্তির এক অদ্ভুত মিশেল। শহরের কোলাহল থেকে দূরে থেকেও তারা জীবনের আনন্দ খুঁজে নিতে জানে। এই মানুষগুলোকে দেখে মনে হয়েছে, সুখের জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিবেশ আর নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া।

ভ্রমণের একপর্যায়ে আমি উরুগুয়ের কলোনিয়া দেল স্যাক্রামেন্টোতেও গিয়েছিলাম। ছোট্ট শহরটি যেন সময়ের ভেতর আটকে থাকা ইতিহাসের বই। পুরোনো শহরের পাথরের রাস্তা, শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ি, নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাতিঘর সবকিছু মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। এখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে, ইতিহাস এখানে শুধু বইয়ে নেই, দেওয়ালে দেওয়ালে, রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে আছে। কলোনিয়ার শান্ত পরিবেশ আমাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

পুরো এই যাত্রা শেষে যখন বিদায়ের সময় এলো; তখন অনুভূতিটা ছিল ভারী কিন্তু সুন্দর। বিদায় মানে সব সময় শেষ নয়। কখনো কখনো বিদায় মানে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। আর্জেন্টিনা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, যে অভিজ্ঞতা দিয়েছে; তা সহজে ভোলার নয়। এই দেশ আমাকে বারবার ডাকবে তার পাহাড় দিয়ে, তার বাতাস দিয়ে, তার মানুষের হাসি দিয়ে।

এইবারের মতো বিদায় নিচ্ছি এই সুন্দর দেশ থেকে। কিন্তু মনে মনে জানি, এটা চূড়ান্ত বিদায় নয়। আমি আবার ফিরবো হয়তো অন্য কোনো ঋতুতে, অন্য কোনো সময় কিন্তু একই ভালোবাসা নিয়ে। আর্জেন্টিনা শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, এটি এখন আমার স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভ্রমণ আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে পৃথিবী কত বিশাল, কত সুন্দর আর মানুষ কতটা ছোট হয়েও কতটা গভীর অনুভূতি বয়ে বেড়াতে পারে।

এই যাত্রা শেষ হলেও অনুভূতিগুলো থেকে যাবে। পাহাড়ের নীরবতা, গ্লেসিয়ারের ঠান্ডা নিঃশ্বাস, লেকের শান্ত জল, মানুষের আন্তরিকতা সবকিছু মিলিয়ে এই ভ্রমণ আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। আর সেই অধ্যায়ের শেষ পাতায় শুধু একটাই কথা লেখা থাকবে ‌‘আবার দেখা হবে’।

এসইউ