সোশ্যাল মিডিয়া

বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতি খোলা চিঠি

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি একটি খোলা চিঠি লিখেছেন সাংবাদিক ও লেখক কাফি কামাল। ১৮ জানুয়ারি দুপুর ২টা ২৮ মিনিটে চিঠিটি তিনি নিজের ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করেন। চিঠিটি জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

‘বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতি একটি খোলা চিঠি

জনাব তারেক রহমান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রথমেই বাংলাদেশের একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনাকে সালাম ও সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা জানাই। আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খোলা চিঠি লিখতে বাধ্য হলাম। হয়তো এটি আপনার দৃষ্টিগোচর হবে, হয়তো হবে না। তবু ইতিহাসের প্রয়োজনে এই বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা জরুরি মনে করেই লিখছি।

জনাব চেয়ারম্যান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানতে পেরেছি, আপনি দেশের কয়েকজন কবি–সাহিত্যিকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সংযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাদের পরিচয় দেখে আমি গভীরভাবে আশাহত হয়েছি।

বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাই—এই সাক্ষাতের জন্য যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, আপনি কি সত্যিই তাদের সম্পর্কে অবগত? ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাদের কোনো প্রতিবাদী সাহিত্যকর্মের কথা কি আপনার জানা আছে? নাকি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট টিমের পরামর্শের ওপর নির্ভর করেই এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে? আমার ধারণা, আপনি আপনার টিমের ওপরই নির্ভর করেছেন। এই প্রসঙ্গে বিনয়ের সঙ্গেই বলতে চাই—দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট টিম এই ক্ষেত্রে আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

আপনার জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বাংলাদেশে খুব অল্পসংখ্যক কবি–সাহিত্যিক সাহস করে কলম ধরেছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবিতা বা সাহিত্য রচনা করা, নির্যাতিত, মামলা-হামলার শিকার কোনো কবি-সাহিত্যিকই এই সৌজন্য সাক্ষাতের আমন্ত্রণ পাননি।

সম্মানিত চেয়ারম্যান, আজ যারা নিজেদের ফ্যাসিবাদবিরোধী বলে পরিচয় দিচ্ছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে তারা উন্নয়ন, প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে নিরাপদ সাহিত্যচর্চায় মগ্ন ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মাত্র ৪৩ জন কবি সেই সংকলনে কবিতা দিতে সম্মত হন। আর সেদিন তা প্রকাশ করতে জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত একাধিক প্রকাশক অস্বীকৃতি জানানোর পর এক তরুণ প্রকাশক সাহস করে এগিয়ে এসেছিলেন। আর পুরো ফ্যাসিবাদী আমলে এটাই ছিল একমাত্র প্রতিবাদী কবিতার সংকলন।

আরও পড়ুনতারেক রহমানের দেশে ফেরা: নেটিজেনদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা 

জনাব চেয়ারম্যান, বাস্তবতা হলো—সেই সংকলনে সাহস করে কবিতা দেওয়া কোনো কবি, সংকলনের সম্পাদক কিংবা প্রকাশক—কেউই আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ পাননি। উদ্বেগজনক বিষয় হলো—আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি আনুকূল্যে খাস জমি বরাদ্দ গ্রহণকারী এবং যুবলীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের গুণকীর্তন করে কবিতা রচনাকারী কবিরাও আপনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এমনকি সেখানে এমন একজন ‘বিপ্লবী’ কবিকেও দেখা গেছে, যিনি ফ্যাসিস্ট পতনের পর আনন্দ মিছিলে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিরাপদ অবস্থান থেকে প্রকাশ্যে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন। আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আজ আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে নেতৃত্বদানকারী একজন কবি—যিনি বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত—তার কাছে ওই সংকলনের জন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতা চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতার পরিবর্তে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একটি কবিতা পাঠান, যা প্রাসঙ্গিক না হওয়ায় সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সম্মানিত চেয়ারম্যান, যে সংকলনের কথা আমি বলছি, সেটির বিষয়ে আপনার দলের সম্মানিত মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবসহ একাধিক সিনিয়র নেতা অবগত। সংকলনের প্রকাশক ও সম্পাদক একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মহাসচিব গ্রেপ্তার না হলে সেই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হতো। দুর্ভাগ্যক্রমে তা সম্ভব হয়নি।

এই খোলা চিঠি যদি আপনার নজরে আসে, বিনীতভাবে অনুরোধ করছি—বিষয়টি একবার যাচাই করে দেখবেন।

জনাব চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট এখন অতীত। রাজনীতিতে ‘সুদিন’ এসেছে। আর সেই সুদিনের কোকিলেরা ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আপনি আজ যাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন, তারা অতীতেও ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিবাদে ছিলেন না, ভবিষ্যতেও থাকবেন না—এই সত্য ইতিহাসেই স্পষ্ট হবে। আপনি প্রকৃত প্রতিবাদী কবি–সাহিত্যিকদের সম্মান জানান বা না জানান, মূল্যায়ন করুন বা না করুন—প্রতিবাদের চিহ্ন ইতিহাসে থেকেই যাবে। কিন্তু ভুল মানুষকে মূল্যায়ন করা এবং প্রকৃত প্রতিবাদীদের অবমূল্যায়নের দায় ইতিহাসের কাছে আপনার ওপরই বর্তাবে। কারণ এই বিষয়ে যাদের আপনি দায়িত্ব দিয়েছেন, ইতিহাস তাদের নাম জানবে না—ইতিহাস বলবে আপনার কথাই।

আমার কোনো শব্দ বা বাক্যচয়ন যদি আপনার মনে কষ্ট দিয়ে থাকে, সে জন্য বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আশাকরি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিককাফি কামাল’

এসইউ