ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আটক রাখার নীতি অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফোর্টিফাই রাইটস’। ভাসানচর রোহিঙ্গাদের কাছে অনেকটা ‘কারাগারে’ পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে ব্যর্থ এই প্রকল্পটি অন্তর্বর্তী সরকারকে এখনই বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ফোর্টিফাই রাইটস বলছে, ‘ভাসানচরে সীমাবদ্ধ করে রাখা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর গুরুতর বিধিনিষেধের মুখে রয়েছেন, যা কার্যত নির্বিচার আটক হিসেবে গণ্য হয় এবং এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।’
বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এ দাবি করে। গেল ৫ বছর ধরে পরিচালিত ১০০ এর বেশি মানুষের সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংস্থাটি এসব দাবি করেছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি ও সংস্থাটির সিনিয়র অ্যাডভোকেসি স্পেশালিস্ট পেট্রিক ফংসাথর্ন।
ফোর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে ভাসানচরের শরণার্থীশিবির বন্ধ করা এবং দ্বীপে ও মূল ভূখণ্ডে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর আরোপিত ব্যাপক ও নির্বিচার আটক প্রথার অবসান ঘটানো, একই সঙ্গে তাদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।’
তিনি বলেন, ‘ভাসানচর কখনোই শরণার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত ছিল না। শরণার্থী হওয়া কোনো অপরাধ নয়, অথচ মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের এমনভাবে আচরণ করা হয়েছে যেন তা অপরাধ। বাস্তবে এই দ্বীপটি কার্যত একটি দণ্ড উপনিবেশের মতো পরিচালিত হচ্ছে, যা আইনসম্মত নয় এবং মানবিকতার পরিপন্থী।’
একশটিরও বেশি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রণীত ৩৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি জানায়, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ শরণার্থী শিবির ভাসানচর বন্ধ করতে হবে এবং মিয়ানমার থেকে আসা সব রোহিঙ্গা শরণার্থীর চলাচলের স্বাধীনতা ও কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১০২ জনের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী, তাদের আত্মীয়স্বজন, মানবিক সহায়তা কর্মী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন। ২০২০ সালের মে থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওই গবেষণা করা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের চলাচল ও কাজের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সীমিত। দীর্ঘদিন ধরে তাদের কার্যত বন্দি করে রাখা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। রোহিঙ্গা সাক্ষাৎকারদাতারা ফোর্টিফাই রাইটসকে জানিয়েছে, সরকারি কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করতে তারা শরণার্থীদের বিভিন্ন সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেমন চাকরি, মাসিক টাকা বা অন্য দেশে পুনর্বাসন।
শরণার্থীরা ফোর্টিফাই রাইটসকে আরও জানিয়েছে, তাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য জোর করা হয়েছে। এতে মিয়ানমারে জোরপূর্বক পাঠানোর হুমকি এবং রেজিস্ট্রেশন কার্ড জব্দের ভয়ভীতিও দেখানো হয়, যেটি ব্যতীত তারা পণ্য ও সেবা নিতে পারে না।
রোহিঙ্গাদের কাছে ভাসানচর ‘অনেকটা কারাগারে’ পরিণত হয়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘একবার দ্বীপে পৌঁছানোর পরে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কারাগারের মতো কঠোর পরিবেশের মুখোমুখি হন। ক্যাম্পের চারপাশে কাটিং তারের বেড়া ও পাহারা দেওয়ার টাওয়ার ছিল, সশস্ত্র রক্ষীরা সার্বক্ষণিক পাহারা দিতো এবং ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি চলত।’
২৯ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা পুরুষ, যিনি মিয়ানমারের মংডৌ শহর থেকে এসেছেন এবং প্রতিবেদন তৈরির সময় দ্বীপে ছিলেন। তিনি ফোর্টিফাই রাইটসকে বলেছেন, ‘এখানকার পরিবেশ কারাগারের মতো। আমরা এখানে একেবারেই থাকতে চাই না, বছরের পর বছর থাকার কথা তো আরও ভিন্ন বিষয়। নৌবাহিনীর পাহারা এবং কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের কারণে মানুষ সহজে যেতে পারে না। যদি কোনো পাহারা বা নিয়ন্ত্রণ না থাকতো, এখানে একজন মানুষও থাকতো না। সবাই এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতো।’
ইএইচটি/এমএমকে