সোশ্যাল মিডিয়া

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভুয়া ফটোকার্ড’ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে

খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল

‘চিলে কান নিয়েছে’ অথচ কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে ছুটছে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ। তথ্যপ্রযুক্তির এ সময়ে গুজব এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কোনো ঘটনা ঘটলেই তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সেইসাথে বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো ও স্টিকার ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড; যা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহের ফলে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। যে প্রভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় মব তৈরির মাধ্যমে নিরীহ মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে। যা খুবই উদ্বেগের।

গুজব মূলত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ছড়ানো হয়। কিছু অসাধু চক্র সাধারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অতিরঞ্জিত তথ্য বা গুজব ছড়ায়। গুজব সাধারণত সাধারণ তথ্যের চেয়ে কিছুটা চটকদার হওয়ায় তা সাধারণ ও অসচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। যা লোকমুখে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিভ্রান্তিকর ও ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি করে।

বাংলাদেশে আগেও গুজব ছড়িয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থ লাভ করেছে। কিছু গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে সারাদেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। ছেলেধরা গুজবের প্রভাবে দেশে গণপিটুনিতে অনেক হতাহত হন। যার অধিকাংশই ছিল নিরীহ নারী, মানসিক রোগী এবং প্রতিবন্ধী। রাজধানীতে তসলিমা বেগম রেণু মেয়ের স্কুলের ভর্তির তথ্য জানতে এসে ছেলেধরা গুজবের শিকার হয়ে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। যা ছিল হৃদয়বিদারক ও নির্মম বেদনার।

চমকপ্রদ তথ্য কিংবা চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে কোনো রকম যাচাই-বাছাই না করে কিছু মানুষ সেটিকে সত্য ভাবতে আরম্ভ করেন। নিজের অজান্তেই সেটি শেয়ার করতে থাকেন। ফলে অনেকেই সরল মনে ধোঁকার মধ্যে পতিত হন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। গত বছর রাসেল ভাইপার সাপ নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতির উন্মেষ ঘটায়। অনেক সময় দেখা যায়, পুরোনো কোনো ছবিকে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমান ঘটনার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। যা অরিজিনাল মনে হলেও প্রকৃত অর্থে মিথ্যা।

আরও পড়ুনবাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা এত মানুষের ভেতর জায়গাটি খালি ছিল কেন? 

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গুজব রটানোর ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। যার ফলে জনমনে খুব সহজেই ধোঁকা দিয়ে স্বার্থ লাভ করা যায়। সাধারণত উল্লেখযোগ্য মানুষের সচেতনতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কুচক্রী মহল গুজব রটায়। এ থেকে ফায়দা লোটে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল কিংবা হেয় প্রতিপন্ন করতে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভূয়া ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষকে প্রকৃত ঘটনা বা অবস্থা বুঝতে অসুবিধা সৃষ্টি করছে। সেইসাথে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরাচ্ছে।

গুজব রটানো দেশে নতুন নয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহে তা ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। গুজবের লাগামছাড়া বিস্তারের মূল কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বহীন ব্যবহার, তথ্য যাচাইয়ের অভাব এবং সচেতনতার সংকট। গুজবের মহামারি রুখতে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো কিছু দেখামাত্র কিংবা শোনামাত্রই অপরের সাথে শেয়ার করা যাবে না। তা যাচাই করে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হয়ে তারপর অপরের সাথে শেয়ার করতে হবে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নিউজ বা তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই তা শেয়ার বা ফরোয়ার্ড করা যাবে না। আগে দেখতে হবে তথ্যের সত্যতা কতটুকু। এজন্য আমাদের গুগলের রিভার্স ইমেজ সার্চ বা টিনআইয়ের মতো প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে।

গুজবের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার জন্য নিজেকে যেমন সচেতন হতে হবে; তেমনই অপরকে সচেতন করতে হবে। জনসাধারণকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও গুজবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং রাষ্ট্র এমন প্রোগ্রাম আয়োজন করতে পারে, যা তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও ফ্যাক্ট চেকিং কৌশল শেখাবে। পাঠ্যপুস্তকে গুজবের ভয়াবহতা এবং এর সামজিক ও ধর্মীয় কুফল নিয়ে আলোচনা সংযোজন করা যেতে পারে। গুজব বন্ধে আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে। গণমাধ্যমকে অবশ্যই কোনো সংবাদ পরিবেশনের আগে সত্যতা যাচাই করে উপস্থাপন করা উচিত। সর্বোপরি আমাদের সচেতন হতে হবে। যদি সচেতন হই, তাহলে ভুয়া ফটোকার্ড বা গুজব তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।

এসইউ