অর্থনীতি

জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি ‘গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি’ নয়!

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তিকে ‘গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা না করার নির্দেশ দিয়েছে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এই নির্দেশনাকে গণঅভ্যুত্থানকেই এক প্রকার অস্বীকার করার সামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাষ্ট্রায়ত্ব পুনঃবিমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশনকে (এসবিসি) এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি বিমা কভারেজের আওতায় না পড়া সংক্রান্ত এসবিসির নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন নির্দেশনার বিষয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিমা নীতি ও ফায়ার ইন্স্যুরেন্স পলিসির শর্ত অনুসারে, গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি বিমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। ফলে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতিকে ‘গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা না করার নির্দেশ-এক প্রকার গণঅভ্যুত্থানকেই অস্বীকার করার সামিল।

তাদের মতে, সরকারের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার লিখিত এমন নির্দেশনায় গণঅভ্যুত্থান অস্বীকার করার আইনগত ভিত্তি তৈরি করবে। এছাড়া আইডিআরএ’র এমন নির্দেশনাকে কাজে লাগিয়ে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির বিপরীতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বেআইনিভাবে বিমা দাবি আদায়ের সুযোগও তৈরি করবে।

আরও পড়ুন:

ক্ষতির পরিমাণ কমলো মেট্রোরেল-সেতু ভবন মেরামতে

সেতু ভবনে হামলায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি 

ডিএনসিসির ১০ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ৬টিতেই ভাঙচুর-আগুন 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ক্ষতির বিপরীতে বিমা দাবির বিষয়ে গত বছরের ৩ মার্চ বেসরকারি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন জরিপ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাধারণ বীমা করপোরেশনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে পপুলার রাইজিং (গণবিপ্লব)-এর দ্বারা সংঘটিত ক্ষতি বিমা কভারেজের আওতায় পড়ে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত বিমা দাবি কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা হবে, তার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি ওই সভায়। সভায় মতামত দেওয়া হয় পলিসির শর্ত অনুসারে, বিমা দাবি পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে বিমা দাবি পরিশোধের সুযোগ নেই।

সভার পর্যালোচনায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না করে, তা ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট বা তৎপরবর্তী সময়ের ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মতামত দেওয়া হয়।

এসবিসির সভার পর্যালোচনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বিমা পলিসির শর্ত অনুসারে- বিমাকৃত সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ‘প্রক্সিমেট কজ’ বা নিকটতম কারণ ‘গণঅভ্যুত্থান’ হলে তা বিমা কভারেজের আওতায় পড়ে না।

একই সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড ফায়ার পলিসির ৬(ডি) নম্বর শর্তানুসারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অল রিস্ক (আইএআর) বিমা পলিসিতেও গণঅভ্যুত্থান বিমার আওতায় পড়ে না। এ ছাড়াও এনডোর্সমেন্টের স্পেশাল কন্ডিশন ৬(বি)’র শর্তানুসারেও পপুলার রাইজিং বিমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। এমনকি পলিসিতে রায়ট অ্যান্ড স্ট্রাইকের ঝুঁকি নেওয়া থাকলেও সেটি গণঅভ্যুত্থান কভার করে না। এসবিসির এই নীতিগত সিদ্ধান্ত সব বিমা কোম্পানিকে পাঠানো হয় গত বছরের ২৩ মার্চ।

এরপর চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সাধারণ বীমা করপোরেশনের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য নির্দেশ দেয় বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ১৭ ডিসেম্বর আইডিআরএ কার্যালয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ‘পপুলার রাইজিং’ কে কারণ উল্লেখপূর্বক বিমা/পুনঃবিমা দাবি নাকচ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ওই সভার বরাত দিয়ে আইডিআরএর চিঠিতে বলা হয়েছে, সাধারণ বীমা করপারেশন তাদের ৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেবে। সেই সঙ্গে সব নন-লাইফ বিমা প্রতিষ্ঠান সব বিমা দাবি ‘পপুলার রাইজিং’ হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি বিমা দাবির বিপরীতে বিমা আইন ও বিধি মোতাবেক সার্ভেয়ার নিয়োগ দেবে এবং সার্ভে রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এটা যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি গণঅভ্যুত্থানে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। গণমাধ্যমে জুলাই-গণঅভ্যুত্থানের সময় হিসেবে বেশি আলোচিত ১৬ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট।

তবে আইডিআরএ নির্দেশনায় এই সময়কেও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং সব বিমা দাবিকে পপুলার রাইজিং হিসেবে বিবেচনা না করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। অর্থাৎ গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিকে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা না করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে করে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো সম্পত্তির বিপরীতে বিমা দাবি উত্থাপিত হলে তা নিষ্পত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে।

বিমা দাবি নিষ্পত্তির বিষয়ে বিমা আইন ২০১০ এর ১২৭(১) ধারায় বলা হয়েছে- এই ধারার অধীন লাইসেন্সধারী বিমা জরিপকারী ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা সম্পর্কিত কোনো ক্ষয়ক্ষতির জরিপ, নিরূপণ কিংবা সমন্বয় করতে পারবে না এবং কোনো বিমাকারী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার লেনদেনকৃত নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায়ের সংশ্লিষ্ট কোনো দাবি এই ধারার অধীনে লাইসেন্সধারী কোনো বিমা জরিপকারী কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতি জরিপকৃত, নিরূপিত বা সমন্বয়কৃত যা হয়, না হলে পরিশোধ করতে পারবে না। 

আবার একইধারা উপধারা (১২)-তে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি এই ধারার বিধান লঙ্ঘনপূর্বক কার্য করলে তিনি অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং লঙ্ঘনকারী কোম্পানি হলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো কার্যধারায় গ্রহণীয় ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখে তার প্রত্যেক পরিচালক, ব্যবস্থাপক, সচিব বা কোম্পানির অন্য কোনো কর্মকর্তা, যিনি জ্ঞাতসারে ওইরূপ লঙ্ঘনের জন্য দায়ী তিনি অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

একটি সাধারণ বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বিমা নীতি অনুসারে গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি বিমা কভারেজের আওতায় পড়ে না। বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তা সবাই জানে। ফলে গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনার জন্য দেশের বাইরের পুনঃবিমা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ দেবে না, এটাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ক্ষয়ক্ষতিকে ‘গণঅভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে আইডিআরএ যে নির্দেশ দিয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। অসাধুরা এটার সুযোগ নিয়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অবৈধভাবে বিমা খাত থেকে টাকা তুলে নিতে পারে।

যোগাযোগ করা হলে সাধারণ বীমা করপোরেশনের পুনঃবিমা বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার এস এম শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, গত বছরের ৩ মার্চের বৈঠকে আমরা জনিয়ে দিয়েছিলাম দেশে পপুলার রাইজিং (গণঅভ্যুত্থান) হয়েছে। পপুলার রাইজিংয়ের সময়ের যে ঘটনা, তার বিমা কভারেজ নেই। এতে সবাই একমত পোষণ করে।

দেশের বাইরে যে পুনঃবিমা করা হয়েছে, তারা কি ক্ষতিপূরণ দেবে? এমন প্রশ্ন করা হলে শাহ আলম বলেন, ‘না, তারা দেবে না। যদি আমরা গণঅভ্যুত্থান হয়নি এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে হয় তো দিতে পারে। কিন্তু ওদের কাছে তো ডকুমেন্ট আছে, ওরা দেবে না। ওরাও বলছে- যেটা তোমার পলিসি কভারে নেই, সেটা আমরা দেবো না।’ 

আরও পড়ুন:

৩৬ জুলাই: ‘রুদ্ধশ্বাস’ অধ্যায়ের সমাপ্তি 

৪ ঘণ্টায়ও বিটিভির আগুন নেভেনি, যেতে পারছে না ফায়ারের গাড়ি 

আইডিআরএ’র বিবেচনায় দেশের সেরা বিমা কোম্পানির তালিকায় যারা 

 আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জাগো নিউজকে বলেন, বাইরের দেশের রিইন্স্যুরার (পুনঃবিমা প্রতিষ্ঠান) টাকা দেবে না বলেই দেশের স্বার্থে ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এটা করা হয়েছে। সেই সময় যে শুধু গণঅভ্যুত্থান হয়েছে তা তো না, অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা আসছিলো, তো ব্যবসার স্বার্থেই আইডিআরএ এ ধরনের সিদ্ধান্ত সবাইকে নিতে বলেছে।

বিমা কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাইরের দেশের পুনঃবিমা প্রতিষ্ঠান টাকা দেবে না- এমন কথা বললে সুমি বলেন, বাইরের দেশের রিইন্স্যুরারকে ওইভাবে বোঝাতে হবে, ওইভাবে তাদের (বিমা কোম্পানি) বলে দেওয়া হয়েছে। ওইভাবে তাদের চিঠি দিতে হবে। এখন কোম্পানি নিজেই যদি বলে- দেবে না, পপুলার রাইজিং হয়েছে। পপুলার রাইজিং ছাড়া কি অন্য কোনো ঘটনা ঘটেনি? আমাদের বিমা আইনের কোথাও তো পপুলার রাইজিংয়ের বিষয়টি নেই।

এমএএস/এসএনআর/এমএমএআর