বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজটির সমস্যা ছিল ফুয়েল কুলারে। কিন্তু সেটা না ধরতে পেরে তিনটি জেনারেটর পরপর পরিবর্তন করেন একজন প্রকৌশলী। এতে সংস্থাটির গচ্চা গেছে ২৩ কোটি টাকা।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীর নাম হীরালাল চক্রবর্তী। তিনি বিমানের প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত। আর বোয়িং ৭৮৭-এর যে উড়োজাহাজে এ ঘটনা ঘটেছে, সেটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর এস২-এজেএক্স (S2-AJX)। গত ২৫ ডিসেম্বর এ উড়োজাহাজেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরেন।
এর একদিন আগে অর্থাৎ, ২৪ ডিসেম্বর বিষয়টি জানিয়ে এক বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন (অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় গোপন রাখে বিমান)। ওই অভিযোগে বলা হয়, সম্প্রতি বোয়িং ৭৮৭ এর রেজিস্ট্রেশন নম্বর এস২-এজেএক্স (S2-AJX) এর L1 এ কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। কিন্তু ঠিক কোথায় কারিগরি ত্রুটি হয়েছে, সেটি না জেনে গত ১০ ডিসেম্বর ওই উড়োজাহাজের একটি ভিএফএসজি (ভ্যারিএবল ফ্রিকোয়েন্সি স্টার্টাটার জেনারেটর) পরিবর্তন করেন বিমানের প্রকৌশলী হীরালাল চক্রবর্তী। কিন্তু তারপরও ত্রুটি ঠিক হয়নি। তখন ১৭ ডিসেম্বর আবার জেনারেটর পরিবর্তন করা হয়। এরপরও ত্রুটি সারেনি। ২৩ ডিসেম্বর আবার জেনারেটর পরিবর্তন করা হয়। অর্থাৎ, একই সমস্যার জন্য স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি ভিএফএসজি বা জেনারেটর পরিবর্তন করা হয়। প্রতিটি ভিএফএসজি পার্ট নম্বর: ৭০০১৩৩০এইচ০৪ এবং প্রতি ইউনিটের আনুমানিক মূল্য ৬ লাখ ২৪ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা)।
ওই অভিযোগে আরও বলা হয়, বিমানের প্রকৌশল বিভাগে একটি দুর্নীতিবাজ চক্র বহুদিন থেকে সক্রিয়। হীরালাল চক্রবর্তী ওই উড়োজাহাজে যথাযথ ট্রাবলশুটিং না করে ধারাবাহিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অতীতেও তার ভুল সিদ্ধান্তের ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রতিটির আর্থিক মূল্য ছিল লাখ লাখ মার্কিন ডলার। আর বিমানের প্রধান প্রকৌশলী (প্রোডাকশন) মো. আলী নাসেরের ছত্রছায়ায় হীরালাল চক্রবর্তী এসব অসংলগ্ন কার্যকলাপ বহুদিন থেকে করছেন। এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে (বর্তমানে চেয়ারম্যান) বহন করা উড়োজাহাজে এমন ঘটনা ঘটে। তাই উপরোক্ত ঘটনার নিরপেক্ষ ও বিস্তারিত তদন্ত করার দাবি জানানো হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের প্রকৌশল বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, পরপর তিনটি জেনারেটর পরিবর্তন করার পর ওই ঘটনা বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন বিমানের সংশ্লিষ্টরা। তখন প্রতীয়মান হয়, প্রকৃত সমস্যাটি জেনারেটরে ছিল না। বরং ‘ফুয়েল কুলার’ ত্রুটিযুক্ত ছিল। যদি প্রথম দফায় সঠিকভাবে সমস্যা নির্ণয় করা হতো এবং ফুয়েল কুলার প্রতিস্থাপন বা মেরামত করা হতো, তবে এই তিনটি মূল্যবান ভিএফএসজি সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করা সম্ভব ছিল। শুধু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠানের ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশি (১ ডলার=১২২ টাকা ধরে) প্রায় ২৩ কোটি টাকা।
আরও পড়ুনশাহজালাল বিমানবন্দরে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে মশাম্যাজিস্ট্রেট নওশাদের স্পর্শে বদলে গেছে শাহজালাল বিমানবন্দর
বিমানের তদন্ত কমিটি গঠন
বিমান সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারি বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করে বিমান কর্তৃপক্ষ। এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে উপ-প্রধান প্রকৌশলীকে (ইঞ্জিনিয়ারিং বেজ মেইনটেন্যান্স)। আর সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ট্রেনিং অ্যারোস্পেস) এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস-প্যাসেঞ্জার রেভিনিউ প্রসেস র্যাপিড)। প্রয়োজনে কমিটি যে কোনো কর্মকর্তাকে কো-অপ্ট করে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে বলেও অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে- বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজে ভিএফএসজি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে কারিগরি সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে একাধিকবার ভিএফএসজি প্রতিস্থাপনের ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ায় অবহেলা, সিদ্ধান্তগত ত্রুটি বা পদ্ধতিগত দুর্বলতা ছিল কি না- এসব বিষয় চিহ্নিত করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের কারিগরি ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে রক্ষণাবেক্ষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়নে সুপারিশ দেওয়াও কমিটির দায়িত্ব। এই কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। তবে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) পর্যন্ত ওই তদন্ত শেষ হয়নি বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানের প্রকৌশলী হীরালাল চক্রবর্তী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিমান তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এখন তদন্ত চলছে।’ এর বাইরে তিনি এ নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুনবিমানের লয়্যালটি ক্লাবে সদস্য হলে ফ্রি টিকিট-লাউঞ্জ সুবিধাশাহজালালে বন্ধ ই-গেট সেবা, ইমিগ্রেশনে সেই আগের ভোগান্তিশাহজালাল বিমানবন্দরে ট্রলি নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা
বিমানের প্রধান প্রকৌশলী (প্রোডাকশন) মো. আলী নাসের জাগো নিউজকে বলেন, ‘যখন কোনো একটি এয়ারক্রাফটে সমস্যা হয়, তখন তা চেঞ্জ করে দেই। ওই এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। অর্থাৎ, যে জেনারেটরটা খুলে রাখা হয়েছিল, সেটি আবার ঠিক করে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু একটিই লাগানো হয়েছে, এর বেশি নয়। তিনটি জেনারেটরের তথ্য জানা নেই। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারপরও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’
ফুয়েল কুলারে সমস্যা থাকলে কেন জেনারেটর পরিবর্তন করা হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আলী নাসের বলেন, ‘উড়োজাহাজের কোথাও কোনো সমস্যা হলে নিজের সমস্যা নিজেই সংকেত দেয়। এগুলো খুঁজে বের করতে হয় না। আমাদের কম্পিউটারের মধ্যে অটোমেটিকভাবে আসে, তোমার এ এ কম্পোনেন্টে সমস্যা হচ্ছে। তখন আমাদের কাজ হলো, দ্রুত সময়ের মধ্যে তার সমাধান করা।’
তিনি বলেন, ‘যখন ফ্লাইট শিডিউল সময় কম থাকে, তখন তা আমরা দেখতে যাই না, জাস্ট চেঞ্জ করে দেই। পরে যখন পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকে তখন তা খুঁটিয়ে সমস্যা সমাধান করে তা লাগিয়ে দেই। এটাই নিয়ম। অর্থাৎ, এখন যদি কোনো এয়ারক্রাফটে সমস্যা হয়, আর যদি দুই ঘণ্টা পর ফ্লাইট থাকে তাহলে তো এখন রিপেয়ারে যেতে পারি না। তখন আমরা পুরো যন্ত্রটাই চেঞ্জ করে দেই।’
জানতে চাইলে বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।’
এমএমএ/এএসএ/এমএফএ/এমএস