শাহজালাল বিমানবন্দরে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে মশা

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ১০:৫১ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০২৬
শাহজালাল বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে স্বস্তি নেই মশার উৎপাতে/জাগো নিউজ

• নিয়মিত ওষুধ ছিটায় না ডিএনসিসি
• বিমানবন্দরের চারপাশের ডোবা-নালায় প্রচুর মশার লার্ভা

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমনের ক্যানোপিতে (দ্বিতীয় তলা) দাঁড়িয়ে আছেন শরীয়তপুরের আরিফুল ইসলাম। পাশে তার বাবা আকতার হোসেনসহ কয়েকজন স্বজন। তারা ইতালির মিলানগামী আরিফুলকে বিদায় জানাচ্ছেন। বিষাদের এই মুহূর্তেও হাত-পা ছুড়তে হচ্ছিল মশার উৎপাতে।

একটুও স্থির থাকলেই মৌমাছির মতো নাকে-মুখে হামলে পড়ছে মশা। শুধু আখতার হোসেনের পরিবার নয়, ওই সময়ে বিমানবন্দরের ক্যানোপিতে দাঁড়িয়ে থাকা সবার অবস্থাই প্রায় একই।

বিমানবন্দরের আগমনী টার্মিনালে মশার উপদ্রব আরও ভয়াবহ। এখানে যেই দাঁড়াচ্ছেন মুহূর্তে ঘিরে ধরছে মশা। কেউই এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারছেন না। রীতিমতো ছটফট করছেন। বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন, রানওয়ে, অ্যাপ্রোন এরিয়াও মশার দখলে। যাত্রীরা বিমানবন্দরের ভেতরও শান্তিতে বসতে পারেন না। আবার অনেক সময় মশা যাত্রীর সঙ্গে উড়োজাহাজেও ঢুকে পড়ছে। বাধ্য হয়ে অনেক এয়ারলাইন্স উড়োজাহাজে মশা মারার ব্যাট রাখছে।

এ বছর প্রথমবারের মতো মশার অভিযোগ শুনলাম। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বিমানবন্দর এলাকায় কোনো লার্ভাসাইড নেই। টার্মিনালের ভেতরে সব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় এমন কোনো অভিযোগ নেই।- শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ

যাত্রী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একটু সুস্থির হয়ে থাকা যায়। মশার উপদ্রবে সবাই অতিষ্ঠ। কিন্তু মশার উপদ্রব বন্ধে কর্তৃপক্ষের কোনো তৎপরতা নেই। মশার কয়েল দিয়ে রাখলেও খোলা জায়গায় ঠিকঠাক কাজ করে না।

আরও পড়ুন
শাহজালাল বিমানবন্দরে ট্রলি নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা
ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদের স্পর্শে বদলে গেছে শাহজালাল বিমানবন্দর
শাহজালাল বিমানবন্দরে সহযাত্রী প্রবেশ নিষিদ্ধ
যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী শাহজালালে ট্রলি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই

বেবিচকের দাবি, তারা বিমানবন্দর এলাকায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল মশার ওষুধ ছিটায়। ফলে মশার উপদ্রব কম। তবে শুষ্ক মৌসুমে মশা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন। কারণ, বিমানবন্দরের চারপাশে প্রচুর ডোবা-নালা রয়েছে। যেখানে মশা জন্মায়। বিমানবন্দরের বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। সেখান থেকেই মশা উড়ে বিমানবন্দরের সীমানায় ঢুকছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে মশা

শাহজালাল বিমানবন্দর সূত্র জানায়, এখন শাহজালাল বিমানবন্দরে দিনে প্রায় ৩০টি এয়ারলাইন্সের প্রায় ১৫০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। এসব ফ্লাইটে দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। তাদের স্বাগত বা বিদায় জানাতে আরও প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার স্বজন বা দর্শনার্থী বিমানবন্দরে যাতায়াত করেন। তারা সবাই মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ। এছাড়া বিমানবন্দরে দায়িত্বরত সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ।

বিমানবন্দরের বাইরে মশক নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সে কাজটি তাদের করতে হবে। বিমানবন্দরের পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে বাউনিয়া এলাকায় অসংখ্য ডোবা আছে। সেখান বেশি মশার লার্ভা রয়েছে। বাউনিয়ার ডোবার মশা বিমানবন্দনরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।– কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার

সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দরের বহির্গমন ও আগমনী ক্যানোপি, অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে সন্ধ্যার আগেই মশার উপদ্রব বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর ঝাঁকে ঝাঁকে মশা ওড়ে। এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকারও জো থাকে না। কোথাও কোথাও কয়েল জ্বলতে দেখা গেলেও খুব একটা কাজ করছে বলে মনে হলো না।

এর বাইরে বিমানবন্দর সংলগ্ন রেলস্টেশনের পেছনে, হাজি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা, আশিয়ান সিটি এবং দক্ষিণখান বাজার, বিমানবন্দরের পেছনে রেলওয়ের একটি খাল, সিভিল অ্যাভিয়েশনের একটি খালি জায়গায়, হাজি ক্যাম্পের পাশে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি জলাশয়সহ আশিয়ান সিটির বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা, নোংরা-বদ্ধ পানি, কচুরিপানা রয়েছে। এসব স্থানে প্রচুর মশা জন্মায় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় লন্ডন থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন কিশোরগঞ্জর মঞ্জুর কবির। ক্যানোপি-১ এর ফটক দিয়ে বের হওয়ার সময় আলাপকালে মঞ্জুর কবির বলেন, ‘দু-এক বছর পরপরই ডিসেম্বরের শেষ দিকে ছুটিতে দেশে আসি। কিন্তু বিমানবন্দরে নামলে যেন মনে হয়, ইউরোপের কোনো মাছ বাজারে গেছি। এখানে মশা-মাছির উপদ্রব ও পরিবেশই সেটা প্রমাণ করে। কিন্তু তারপরও দেশের মাটির টানে বারবার ছুটে আসি। সরকারের উচিত বিমানবন্দরসহ ঢাকায় মশার উপদ্রব কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।’

বিমানবন্দরের আশপাশে ১৫টির মতো খাল-বিল জলাশয় আছে। যেগুলোর মালিক সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং দু-একটি সাধারণ বিমা করপোরেশনের। এগুলোই মশার প্রধান কারণ।- ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী

আশকোনা এলাকার বাসিন্দা শওকত কামাল বলেন, ‘আশকোনাসহ পুরো উত্তরায় মশার উপদ্রব আছে। সিটি করপোরেশন নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটায় না। যার কারণে এ এলাকার মানুষ শান্তিতে থাকতে পারে না। সিটি করপোরেশনের লোকজনকে বারবার বলা হচ্ছে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার জন্য। এখানে কোটি কোটি মশার লার্ভা।’

শাহজালাল বিমানবন্দরে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে মশা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহজালাল বিমানবন্দরের অন্তত তিনজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, বিমানবন্দরে সারা বছরই মশার দাপট চলে। রানওয়ে, ক্যানোপি ব্রিজ, গ্রিন চ্যানেল ও টার্মিনালের ভেতরেও আছে মশার দৌরাত্ম্য। এতে একপ্রকার অসহায় বিমানবন্দর এলাকায় কর্মরত লোকজন, সাধারণ যাত্রী ও দর্শনার্থীরা। এর মধ্যে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি থাকে। মার্চ-এপ্রিলে বৃষ্টি নামলে দাপট কিছুটা কমে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বছর প্রথমবারের মতো মশার অভিযোগ শুনলাম। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বিমানবন্দর এলাকায় কোনো লার্ভাসাইড নেই। টার্মিনালের ভেতরে সমস্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় এমন কোনো অভিযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘শাহজালাল বিমানবন্দর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এ বিমানবন্দরের আশপাশে যেসব খোলা জায়গা রয়েছে, সেখানে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কাজ না করলে মশা পাওয়া যায়। এসব মশা উড়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে আসে। আমরা সিটি করপোরেশন সংলগ্ন এলাকা বা খাল পরিষ্কার করার জন্য চিঠিও দিয়েছি।’

এর আগে ২০২১ সালে বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। তখন ওই বছরের ১৬ মার্চ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রবের কারণ জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় বেবিচক। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বেবিচক দাবি করে, বিমানবন্দর পরিচ্ছন্ন ও আলোকিত হওয়ায় রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মশা চলে আসে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে মশক নিধন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সংঘবদ্ধ কার্যক্রম অপরিহার্য।

শাহজালাল বিমানবন্দরে মশা নিয়ন্ত্রণে বেবিচকের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে আমাকে ডাকে ভিজিট করার জন্য। দুই সপ্তাহ আগে আমি বিমানবন্দরে গিয়েছি। এয়ারপোর্টে কিছু কাজ চলছে এখন। তৃতীয় টার্মিনাল সংলগ্ন দুটি লেক আছে। সেখানে প্রচুর কিউলেক্স মশার লার্ভা পেয়েছি। এগুলো নিধনে তাদের পরামর্শ দিয়ে আসছি। এতদিনে তারা তা করে ফেলার কথা।’

তিনি বলেন, বিমানবন্দরের সীমানাঘেঁষা এলাকা বাউনিয়া। সেখানে বেশ কিছু ডোবা আছে, যেগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। ওই ব্যক্তি মালিকানাধীন ডোবায় মশার লার্ভা প্রচুর। সেগুলো কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এসব ডোবায় প্রচুর কিউলেক্স মশা বিমানবন্দরে ঢুকছে। আরেকটা হচ্ছে হাজি ক্যাম্পের পাশের একটি বড় খাল। এ খাল থেকে প্রচুর মশা বিমানবন্দরে ঢুকছে। এই দুটি জায়গা যদি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তাহলে বিমানবন্দরে মশাটা কমে যাবে।’

কবিরুল বাসার বলেন, বিমানবন্দরের বাইরে মশক নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সে কাজটি তাদের করতে হবে। বিমানবন্দরের পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে বাউনিয়া এলাকায় অসংখ্য ডোবা আছে। সেখান বেশি মশার লার্ভা রয়েছে। বাউনিয়ার ডোবার মশা বিমানবন্দনরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।’

তবে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের আশপাশে ১৫টির মতো খাল-বিল জলাশয় আছে। যেগুলোর মালিক সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং দু-একটি সাধারণ বিমা করপোরেশনের। এগুলোই মশার প্রধান কারণ। এগুলো পরিষ্কারের ব্যাপারে বা সেখানে ইনসেক্টিসাইড ছিটানোর ব্যাপারে সিভিল অ্যাভিয়েশনের কিছু অবজারভেশন সব সময় থাকে।’

তিনি বলেন, ‘যার পরিপ্রেক্ষিতে গত দুই বছর ধরে বিমানবন্দরে মশক নিধনের এই দায়িত্বটা সিভিল অ্যাভিয়েশন নিজেরাই নিয়েছে এবং তাদের নিজস্ব একটি টিম আছে। এই টিমের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাসার। ডিএনসিসি গত দুই বছর আগে তাদের মশক নিধনের জন্য কিছু ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন হ্যান্ডওভার করেছে।’

এমএমএ/এএসএ/এমএফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।