বাংলাদেশ আজ দ্রুত পরিবর্তনশীল এক গতিময় সমাজ। অর্থনীতি, রাজনীতি, জলবায়ু, প্রযুক্তি, নগরায়ণ—সবকিছুই এক ত্বরান্বিত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা সমাজের প্রতিটি স্তরকে প্রভাবিত করছে। এই পরিবর্তন কেবল পরিসংখ্যানগত বা অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক জীবন, সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং ক্ষমতাবিন্যাসের মূলে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মাঝেও একটি বড় ফাঁক স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে: বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎপাদিত জ্ঞান সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না, আর সামাজিক আন্দোলন ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুব কমই ব্যবহৃত হয়। একদিকে গবেষকরা গবেষণা করেন, কঠিন জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করে তাদের পেশাদার দায়িত্ব পালন করেন; অন্যদিকে তৃণমূলে কর্মীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করেন—কিন্তু তাদের মাঝে কার্যকর, ফলপ্রসূ সংযোগ নেই। এই বিচ্ছিন্নতাই দেখায় কেন বাংলাদেশে জনমুখী সমাজতত্ত্ব (Public Sociology) এখন অত্যন্ত জরুরি, কেবল একটি শিক্ষাগত ধারণা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া হিসেবে।
আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক মাইকেল বুরাওয়ের (Michael Burawoy) মতো তাত্ত্বিকরা পাবলিক সমাজতত্ত্বকে দেখেন গবেষণা ও সমাজের মধ্যে দ্বি-মুখী সংলাপ (Two-way Dialogue) গড়ে তোলার একটি মাধ্যম হিসেবে। তাঁর মতে, সমাজতত্ত্বের চারটি প্রকারভেদ রয়েছে—পেশাদার (Professional), সমালোচনামূলক (Critical), নীতিগত (Policy) এবং জনমুখী (Public)। বুরাওয়ের দৃষ্টিতে, পেশাদার সমাজতত্ত্ব যদি জ্ঞানের ভিত্তি ও বৈধতা তৈরি করে, তবে সমালোচনামূলক সমাজতত্ত্ব সেই জ্ঞানকে নৈতিক ও তাত্ত্বিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করে। এরপর নীতিগত সমাজতত্ত্ব নীতিনির্ধারকদেরকে ব্যবহারিক তথ্য সরবরাহ করে। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এই জ্ঞানকে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের সাথে এক ফলপ্রসূ বিতর্কে অংশ নেওয়ার কাজটিই হলো পাবলিক সমাজতত্ত্ব। বাংলাদেশে এই সত্য আরও বেশি প্রযোজ্য। দারিদ্র্য ও বৈষম্য, জলবায়ু-অভিবাসন, নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রমিক অধিকার, শিক্ষার সংকট, ডিজিটাল বিভাজন, শহরের বসবাসযোগ্যতা—এসব সমস্যার মূলে রয়েছে গভীর সমাজগত কাঠামো, যা বুঝতে হলে সমাজতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি অপরিহার্য। কিন্তু গবেষণার ফলাফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে এগুলি বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। বুরাওয়ের তত্ত্বে, পাবলিক সমাজতত্ত্ব সমাজকে কেবল বুঝতে সাহায্য করে না, বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
পাবলিক সমাজতত্ত্বের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো এই জ্ঞানকে গণভাষায় অনুবাদ করা। বাংলাদেশের অনেক গবেষণা ইংরেজিতে, কঠিন তাত্ত্বিক ভাষায়, খুব সীমিত শ্রোতার জন্য লেখা হয়। ফলে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, এমনকি সামাজিক সংগঠনও সেই গবেষণার সুবিধা নিতে পারে না। এই 'জ্ঞানের বন্টনজনিত অসাম্য' সমাজে এক ধরনের 'এলিট ডিসকোর্স' তৈরি করে, যেখানে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না এবং অ্যাকাডেমিক কাজগুলো জনগণের জীবন থেকে দূরে সরে যায়।
পাবলিক সমাজতত্ত্ব গবেষকদের উৎসাহিত করে গণমাধ্যমে কলাম লিখতে, কমিউনিটি কর্মশালায় অংশ নিতে, টেলিভিশনে কথা বলতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে। যখন সমাজতাত্ত্বিকরা ব্যাখ্যা করেন কেন বস্তি টিকে থাকে (কারণ বস্তি শ্রমিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, কেবল দারিদ্র্যের ফল নয়), কেন লিঙ্গ-সহিংসতা কমে না (কারণ ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রভাব), কেন যুব বেকারত্ব বাড়ছে (কারণ শিক্ষার বাজার ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে পদ্ধতিগত অসঙ্গতি বিদ্যমান)—তখন মানুষ ব্যক্তিকে দোষ না দিয়ে কাঠামোগত সমস্যাগুলি চিনতে শেখে। এই কাঠামোগত ব্যাখ্যা ব্যক্তিকেন্দ্রিক দোষারোপের সংস্কৃতি (Culture of Individual Blame) থেকে সমাজকে মুক্ত করে এবং জনসচেতনতা বাড়ায়। সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা যদি এই সমাজতাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে খবর পরিবেশন করেন, তাহলে জনপরিসরের আলোচনায় এক গভীরতা আসে, যা সামাজিক সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধানে সহায়ক হয়।
অ্যাক্টিভিজম বা সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও পাবলিক সমাজতত্ত্ব অত্যন্ত কার্যকর। অনেক সময় আন্দোলনগুলো নৈতিক তাগিদ বা আবেগ থেকে পরিচালিত হলেও, সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তাদের কৌশলগত শক্তি বাড়াতে পারে। জলবায়ু-ন্যায়বিচার আন্দোলন (Climate Justice Movement), শ্রমিক অধিকার সংগ্রাম, নারী অধিকার আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার বিশ্লেষণ আন্দোলনকে আরও যুক্তিসঙ্গত, প্রমাণভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যখন জলবায়ু কর্মীরা উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁধের দাবিতে লড়াই করেন, তখন একজন পাবলিক সমাজতাত্ত্বিক দেখাতে পারেন যে এই বাঁধগুলো কীভাবে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এবং বিকল্প সামাজিক অভিযোজন কৌশল কী হতে পারে।
সমাজতত্ত্ব অ্যাক্টিভিজমকে দেয় সমস্যার উৎস, কাঠামো ও ক্ষমতাবিন্যাস বুঝে কাজ করার ক্ষমতা। বুরাওয়ের মতে, অ্যাক্টিভিজম হলো সমাজতত্ত্বের আবেগিক শক্তি (Moral Force), কিন্তু এই আবেগ তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন তা সমালোচনামূলক সমাজতত্ত্বের (Critical Sociology) বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধারালো হয়। পাবলিক সমাজতত্ত্ব অ্যাক্টিভিস্টদের কেবল কী করতে হবে তা বলে না, বরং কেন কাজটি করতে হবে এবং এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব কী হতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়। এটি অ্যাক্টিভিস্টদের তাদের দাবিগুলোকে কেবল নৈতিকতা বা আবেগ থেকে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট সামাজিক প্রমাণ এবং তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ায় অ্যাক্টিভিস্টরা সমাজের "সহযোগী" হয়ে ওঠেন, যাদের সঙ্গে সমাজতাত্ত্বিকরা গবেষণা পরিচালনা করেন, তাদের ওপর গবেষণা করেন না।
সমাজের জন্য একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা। যে সমাজ নিজেকে বোঝে, সে সমাজই পরিবর্তন আনতে পারে। পাবলিক সমাজতত্ত্ব বাংলাদেশকে এমন একটি সমাজে পরিণত করতে পারে—যেখানে একাডেমিয়া, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ তৈরি হয়; যেখানে গবেষণা মানুষের জীবনে প্রয়োগ হয়; এবং যেখানে সামাজিক পরিবর্তন হয় চিন্তাশীল, ন্যায়সংগত ও জন-কেন্দ্রিক।
নীতিনির্ধারণেও পাবলিক সমাজতত্ত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য, বিশেষত নীতিগত সমাজতত্ত্বের (Policy Sociology) ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে নীতিমালা প্রায়ই সুন্দরভাবে লেখা হয়—কিন্তু বাস্তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে। এর মূল কারণ হলো, নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সামাজিক বাস্তবতা, তৃণমূলের মানুষের অভিজ্ঞতা এবং কাঠামোগত বাধাগুলি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়।
বড় উদ্যোগগুলোতে সামাজিক গবেষণা যোগ হলে বোঝা যেত মানুষ কীভাবে সেবা পায়, কোথায় বাধা, কোন নীতি কাদের উপকারে আসে বা কারা বঞ্চিত থাকে। সমাজতাত্ত্বিকদের নীতি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে সিদ্ধান্ত হবে আরও বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনগণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। বুরাওয়ের তত্ত্বে, নীতিগত সমাজতত্ত্ব নীতিনির্ধারকদেরকে তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এর অর্থ হলো, শুধু অর্থনৈতিক ডেটা বা প্রবৃদ্ধির হার দেখে নয়, বরং ক্ষমতা, আস্থা, দুর্নীতি, লিঙ্গীয় ভূমিকা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক পুঁজির মতো জটিল সামাজিক উপাদানগুলোকে নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগের ক্ষেত্রে, পাবলিক সমাজতত্ত্ব দেখাতে পারে যে কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতা, ব্যবহার এবং এর সামাজিক প্রভাব (যেমন: সাইবার বুলিং, ভুল তথ্য) বোঝার জন্য সামাজিক গবেষণা অপরিহার্য। নীতিগত সমাজতত্ত্বের প্রয়োগ নিশ্চিত করবে যে, নীতিনির্ধারণের সময় সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরও শোনা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব পরিসরেও পাবলিক সমাজতত্ত্ব এক গভীর সংস্কার এবং নতুন সম্ভাবনা খুলে দিতে পারে। সমাজতত্ত্বের শিক্ষা কেবল প্রবন্ধ প্রকাশ বা পরীক্ষাভিত্তিক ফলাফল দিয়ে শেষ হয় না। এই শিক্ষা তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন তা সমাজের কাজে লাগে। পাবলিক সমাজতত্ত্বের ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষার্থীরা মাঠে কাজ করলে, এনজিও ও কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হলে, নীতি আলোচনা বা জনপরিসরের বিতর্কে অংশ নিলে তাদের শেখা হয় আরও গভীর ও বাস্তব। এটি কেবল তাদের পেশাদার সমাজতাত্ত্বিক হওয়ার পথকে প্রশস্ত করে না, বরং তাদেরকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে।
এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সমাজ-সম্পৃক্ত জ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা তাদের সামাজিক বৈধতা ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি করে। শিক্ষার্থীরা যখন বস্তি বা জলবায়ু-আক্রান্ত এলাকায় গবেষণা করে, তখন তারা শুধু তত্ত্বের প্রয়োগ শেখে না, বরং সমাজের জটিলতা এবং মানবিক দিকগুলো সরাসরি অনুধাবন করে। এটি কেবল শিক্ষণ পদ্ধতিকে উন্নত করে না, বরং গবেষণার গুণগত মানও বাড়ায়, কারণ এতে সমস্যার মূল এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে গবেষণার সংযোগ স্থাপিত হয়, যা পেশাদার সমাজতত্ত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বুরাওয়ের মতে, পেশাদার সমাজতত্ত্বকে তার ধারণাগত ভিত্তি মজবুত রাখতে সমালোচনামূলক ও পাবলিক সমাজতত্ত্বের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত থাকতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাবলিক সমাজতত্ত্ব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—সামাজিক আস্থা তৈরি করা (Building Social Trust)। সমাজে বিভাজন, গুজব, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি—এসবের ফলে যৌক্তিক আলোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেরুকরণ বৃদ্ধি পায়। এখানে সমাজতাত্ত্বিকদের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা সমাজকে দেখাতে পারে কীভাবে সামাজিক পরিবর্তন ঘটে, কোন শক্তিগুলো কাজ করে, এবং কোন তথ্য বিভ্রান্তিকর।
পাবলিক সমাজতাত্ত্বিকদের বস্তুনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর জনপরিসরে যৌক্তিকতার একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে। যখন একজন সমাজতাত্ত্বিক প্রমাণিত তথ্য এবং তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করে কোনো বিতর্কিত বিষয় (যেমন: সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা ভোটদানের প্রবণতা) ব্যাখ্যা করেন, তখন সেই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক বা দলীয় প্রচারণার চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য এমন বস্তুনিষ্ঠ, অ-দলীয় কণ্ঠস্বর অপরিহার্য, যা নাগরিকদেরকে নিজেদের সমাজের জটিলতা বুঝতে সাহায্য করে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ কমাতে সহায়ক হয়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক অবস্থান বজায় রেখে পাবলিক সমাজতত্ত্ব নাগরিকদের যৌক্তিক তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের আজকের চ্যালেঞ্জগুলো মূলত সামাজিক—জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর নিরাপত্তা, কৃষি পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, ডিজিটাল পরিবর্তন—এসবের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও ক্ষমতার কাঠামো। তাই কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সমাজকে বুঝতে হবে নিজেদের সমস্যার সামাজিক ভিত্তি। আর এই বোঝার সেতুবন্ধনই তৈরি করতে পারে পাবলিক সমাজতত্ত্ব।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত নগরায়ণ, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন—এসবই একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে, তবে একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাও তৈরি করে। এই সময়ে কেবল অর্থনৈতিক তথ্য নয়, সমাজগত ব্যাখ্যাও জরুরি। কেবল অ্যাক্টিভিজম নয়, বিশ্লেষণও প্রয়োজন। কেবল নীতি নয়, নাগরিকের অংশগ্রহণও দরকার। আর এই তিনটির মধ্যে সেতু তৈরি করতে পারে পাবলিক সমাজতত্ত্ব।
পাবলিক সমাজতত্ত্ব কেবল একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা নয়, এটি বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজের জন্য একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা। যে সমাজ নিজেকে বোঝে, সে সমাজই পরিবর্তন আনতে পারে। পাবলিক সমাজতত্ত্ব বাংলাদেশকে এমন একটি সমাজে পরিণত করতে পারে—যেখানে একাডেমিয়া, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ তৈরি হয়; যেখানে গবেষণা মানুষের জীবনে প্রয়োগ হয়; এবং যেখানে সামাজিক পরিবর্তন হয় চিন্তাশীল, ন্যায়সংগত ও জন-কেন্দ্রিক। এই পথে হাঁটলেই বাংলাদেশের সমাজতত্ত্ব কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক ডিসিপ্লিন হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
লেখক: সমাজবিজ্ঞান ও উন্নয়ন বিষয়ক কলাম লেখক ও গবেষক।
এইচআর/এমএস