মতামত

কতটা সুখের সাদ্দামের এই জামিন

২২ বছর বয়সের এক মা।লাশ হয়ে ঝুলছে।অদূরে-মেঝেয় পড়ে আছে ৯ মাস বয়সের শিশু সন্তান।নিথর-নিস্পন্দ।শিশুটির বাবা এবং ওই তরুণীর স্বামী যশোর কারাগারে।তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি--জুয়েল হাসান সাদ্দাম।স্ত্রী সন্তানের লাশ দেখতে বাড়ি যাওয়া হয়নি তাঁর।দুটো লাশ্ নেয়া হয়েছে কারাগারে,স্বামী ও বাবা সাদ্দামকে দেখানোর জন্য।কারণ প্যারোলে মুক্তি পাননি তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই দুর্বিসহ চিত্র।তোলপাড় সৃষ্টি হয় অভাবিত মৃত্যুর ঘটনায়।জল্পনার ডালপালা ছড়ায় এই মৃত্যু ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে।

দেশের প্রচলিত আইনে বন্দীদের স্বজনের মৃত্যু হলে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ আছে।সাদ্দাম সেই সুযোগটি পাননি।ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি পাওয়া নিয়ে।যশোহর জেলা প্রশাসকের দফতর বলছে,সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির জন্য কোনো আবেদন তাদের হাতে পৌঁছায়নি।কিন্তু কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী-‘জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবার ও স্বজনরা দাবি করেন, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর তাকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি বলে তারা অভিযোগ তোলেন।’ আসলে সত্য কোনটা? যেটাই সত্য হোক বাস্তবতা হচ্ছে সাদ্দামের কষ্ট ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। সাদ্দাম কেন কারাগারে,তাঁর জামিন হয়নি কেন, সব প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রচারের নিচে।

যশোহর জেলা প্রশাসনে কোনো আবেদন পৌঁছায়নি এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। সাদ্দামের পক্ষে যারা আবেদন করেছেন তারাও বলেননি তারা যশোহরে আবেদন করেছেন।প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী বাগেরহাটে তারা দরখাস্ত নিয়ে গেলে তাদের আবেদন গ্রহণ করেনি প্রশাসন। যুক্তি ছিলো সাদ্দাম বাগেরহাটে বন্দী নন তাই তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। এখানেই কিছু প্রশ্ন জাগে। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, যে কারাগারে বন্দীর অবস্থান সেখানকার প্রশাসনেই আবেদন করতে হয়।কিন্তু বন্দী যদি নিজ জেলার বাইরে কিংবা দূরবর্তী কারাগারে বন্দী হয়ে থাকেন তাহলে আইনি কী সুযোগ তাকে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা ২০১৬ সালের “প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালা”র খ-এ উল্লেখিত বিধানের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। বলা আছে-‘কোন বন্দী জেলার কোন কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে ঐ জেলার অভ্যন্তরে যে কোন স্থানে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। অপরদিকে কোন বন্দী নিজ জেলায় অবস্থিত কোন কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক না থেকে অন্য জেলায় অবস্থিত কোন কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনা করে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই দুর্গম এলাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দূরত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর কিংবা না-মঞ্জুরের ক্ষমতা সংরক্ষণ করবেন‘’

আইন বিশেষজ্ঞ না হলেও স্বাভাবিক বিবেচনা থেকে বলা যায় সাদ্দাম তার স্ত্রী ও সন্তানের জানাজায় উপস্থিত হতে প্যারোলে মুক্তি পেতে পারতেন। যদি তেমনটা হতো তাহলে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেটা হতো না। কিংবা বিচারহীনতা কিংবা অমানবিকতার কারণে কেউ এ নিয়ে মুখও খুলতো না।

বাংলাদেশে সাদ্দামের মতো চমকে দেওয়া এমন ঘটনার সংবাদ একবারে নতুন নয়।বছর কয়েক আগে গাজীপুরে এক রাজনৈতিক নেতাকে তার মায়ের জানাজায় ডান্ডাবেরি পরা অবস্থায় দেখা গিয়েছিলো। আর সেই ছবি তৎকালীন পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছিল। তখনও সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। প্রচণ্ড সমালোচনা হয়েছিলো সেটা নিয়ে। স্পষ্টতই বোঝা গিয়েছিলো প্রশাসনের অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ছিলো সেই ঘটনা। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়েছিলো। যতটা মনে আসে আমিও বিষয়টিকে আমার লেখায় এনেছিলাম।তখনও আশা করেছিলাম আর কোনো উদাহরণ যেন বাংলাদেশে তৈরি না হয়। কিন্তু উদাহরণ আরও তৈরি হলো। গত অক্টোবরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।ওই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ণ সৃষ্টি হয় সাবেক মন্ত্রী হাতকড়া অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন এমন অভিযোগসহ।সরকারিভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশোধনী দিয়েছে প্রকাশিত সংবাদের। বলা হয়েছিলো,প্রকাশিত ছবি মৃত্যুকালীন নয়,চিকিৎসাধীন থাকাকালের। তাও মর্মান্তিক।কারণ চিকিৎসাধীন এবং জ্ঞানহারা একটি মানুষ,আশির বেশি যার বয়স তার পক্ষে কি পালিয়ে যাওয়া সম্ভব? জানি না মৃতপ্রায় একজন মানুষকে এভাবে হাতকড়া পরানোর পক্ষে আইনি বিধান আছে কি না। বাস্তবতা হচ্ছে এই অমানবিক আচরণ করা হয়েছিলো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা,সাবেক মন্ত্রীর প্রতি। তখনও মানুষ বলেছে, আর এমন ঘটনা যেন দেখতে না হয়।

কিন্তু আবার এমন অমানবিক দৃশ্য দেখতে হলো।যা আরও নির্মম।

সরকারি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া বিষয়ে।কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা থামেনি।স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে স্বাভাবিক কারণেই সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছেন।কিন্তু একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান। কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার বডি ল্যাংগুয়েজ ছিলো অনাকাঙ্ক্ষিত।যা মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে।

সর্বশেষ বাগেরহাটের সেই সাদ্দাম উচ্চআদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। কিন্তু তিনি বাড়ি গিয়ে স্ত্রী সন্তান নয় দেখবেন তাদের কবর।

আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা সবার কর্তব্য।কিন্তু আইনের নামে প্রতিশোধ স্পৃহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়াটাকে অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই তার বিচার করতে হবে। মনে রাখতে হবে,যত বড় অপরাধই কেউ করে থাকুক না কেন,নাগরিক হিসেবে তার কিছু আইনগত অধিকারও পাওনা থাকে। রাষ্ট্র সেই অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য।অপরাধী যেমন অপরাধের জন্য শাস্তি প্রাপ্য হয়,রাষ্ট্র যদি নাগরিকের অধিকার হরণ করে, তাহলে রাষ্ট্রকেও এর দায় বহন করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন অমানবিক কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ তখন ভুক্তভোগীর কৃতকর্মের দিকে তাকায় না,নির্মমতাকে ধীক্কার জানায়।

এমন অমানবিক আচরণ মানুষকে এতটাই আবেগপ্রবণ করে দেয়,তখন তারা ভুক্তভোগীর পক্ষে বিনাপ্রশ্নে চলে যায়। হয়তো সেই ব্যক্তিটি প্রকৃতই অপরাধীও হতে পারেন, মানুষের কাছে তার অপরাধটা অগ্রাহ্য হয়ে পড়ে।সামাজিকভাবে এর যে প্রতিক্রিয়া হয় আইনের শাসনের অনুকূলে নাও যেতে পারে। সুতরাং অপরাধীর বিচার যেমন প্রয়োজন তেমনি অভিযুক্ত হলেই তাকে অগ্রিম শাস্তি দেওয়াটা গ্রহণযোগ্য নয়। সাদ্দামের জামিন পাওয়াতেই যেন বিষয়টা শেষ হয়ে না যায়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করতে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত কারণ উদঘাটনের জন্য।

লেখক-সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এমএস