প্রশ্ন: জাহাজে দীর্ঘ সফরে থাকা ব্যক্তি কি মুসাফির গণ্য হবেন? জাহাজের যাত্রীরা এবং যারা জাহাজে কাজ করেন তারা অনেক সময় লাগাতার দুই/ তিন মাসও জাহাজে থাকেন এবং সেখানে খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রামসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিজের বাসস্থলের মতোই হয়ে থাকে। এ অবস্থায় তারা কি কসর নামাজ পড়বেন নাকি পূর্ণ নামাজ পড়বেন?
উত্তর: জাহাজ যদি চলন্ত অবস্থায় থাকে তাহলে ওই জাহাজ যত বড়ই হোক এবং থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা যেমনই হয়ে থাকুক, সেখানে ইকামতের নিয়ত শুদ্ধ হয় না। তাই চলন্ত জাহাজে ১৫ দিন বা তার বেশি অবস্থানের নিয়ত করলেও জাহাজের যাত্রী, কর্মচারীসহ সবাই মুসাফির গণ্য হবেন এবং মুসাফিরের মতই কসর নামাজ পড়বেন। একইভাবে গভীর সমুদ্রে বা উপকূলের অনেক দূরে নোঙ্গর করলেও সেখানে ইকামতের নিয়ত শুদ্ধ হয় না, তাই গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ দিন নোঙ্গর করে থাকলেও জাহাজে অবস্থানকারীরা মুসাফির গণ্য হবেন।
আর জাহাজ কোন বন্দর বা এলাকায় থামলে তাতে অবস্থানের হুকুম ওই বন্দর বা এলাকায় অবস্থানের মতই। অর্থাৎ ওই বন্দর বা এলাকা যদি জাহাজে অবস্থানকারী কারো নিজের এলাকা বা আবাসস্থল হয়, তাহলে বন্দরে ভেড়ামাত্রই তিনি মুকিম হয়ে যাবেন। আর যদি তা না হয়, তাহলে বন্দরে ১৫ দিন বা তার বেশি অবস্থানের নিয়ত করলে যাত্রী বা কর্মচারীরা মুকিম হবেন। আর যদি তারা ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করেন, অথবা কত দিন থাকতে হবে তা তাদের জানা না থাকে, তাহলে তারা মুসাফির গণ্য হবেন এবং নামাজ কসর করবেন।
কসর নামাজের নিয়ম
কেউ তার আবাস থেকে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়ত করে নিজের শহর থেকে বের হলে শরিয়তের পরিভাষায় তাকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির গণ্য হওয়ার জন্য সফর পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করা জরুরি নয়। সফরের নিয়তে নিজের শহর থেকে বের হয়ে এক মাইল অতিক্রম করলেও সে মুসাফির গণ্য হয়।
মুসাফির ব্যক্তির জন্য জোহর, আসর ও ইশার ফরজ নামাজ কসর করা অর্থাৎ চার রাকাতের জায়গা দুই রাকাত পড়া ওয়াজিব। অনেকে মনে করেন কসর করা ঐচ্ছিক—এই ধারণা ঠিক নয়। সফর অবস্থায় ইচ্ছাকৃত কসর না করা গুনাহের কাজ। তাই ইচ্ছাকৃত কসর বাদ দিয়ে পূর্ণ নামাজ পড়া যাবে না।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাদের নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জবানে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত নামাজ ফরজ করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ৬৮৭)
মুসাফির ব্যক্তি যদি ভুল করে চার রাকাত বিশিষ্ট কোনো ফরজ নামাজ কসর না করে চার রাকাতই পড়ে নেয়, তাহলে দেখতে হবে সে দুই রাকাতের পর বৈঠক করেছে কি না, যদি করে থাকে তাহলে তার ওই ফরজ নামায আদায় হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম দুরাকাত ফরজ এবং শেষ দুই রাকাত নফল হবে। নামাজের ভেতরেই যদি এ ভুলের কথা মনে পড়ে, তাহলে নামাজ শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, কোনো মুসাফির ভুলে জোহরের নামাজ চার রাকাত পড়ে ফেললে সাহু সিজদা করবেন। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক: ২/৫৪১)
নামাজের ভেতরে মনে না পড়লে এবং সাহু সিজদা না দিলেও নামাজ হয়ে যাবে। আবার পড়তে হবে না।
আর যদি চার রাকাত বিশিষ্ট কোনো ফরজ নামাজ চার রাকাত পড়ে এবং মাঝের বৈঠকও করতে ভুলে যায়, তাহলে তার ফরজ বাতিল হয়ে ওই নামাজ নফল হয়ে যাবে। তাকে পুনরায় ওই ফরজ নামাজ পড়ে নিতে হবে। (আদ-দুররুল মুখতার: ২/১২৮)
মাগরিব ও ফজরে কসর নেই। এ দুই ওয়াক্তের ফরজ নামাজ যথাক্রমে তিন রাকাত ও দুই রাকাতই আদায় করতে হবে।
ফরজ ছাড়া অন্য নামাজগুলোও কসর করার নিয়ম নেই। তাই সেগুলো আদায় করলে পরিপূর্ণভাবেই আদায় করতে হবে। বেতর তিন রাকাতই আদায় করতে হবে। তবে সুন্নাতে মুআক্কাদা নামাজ অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজের সাথে প্রতিদিন যে বারো রাকাত সুন্নাত নামাজ আমরা আদায় করে থাকি, এগুলো সফর অবস্থায় আবশ্যক থাকে না। ক্লান্তি বা ব্যস্ততা থাকলে এই নামাজগুলো ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে সময় সুযোগ থাকলে পড়ে নেওয়াই উত্তম।
ওএফএফ/এমএস