নির্বাচনি প্রচারণা আর গণসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গার দুই আসনের ভোটের মাঠ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ চলে গ্রাম-গঞ্জ, বাজার, হাট আর পাড়া-মহল্লায়। উঠান বৈঠক, পথসভা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা, সব মিলিয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো ঘাটতি রাখতে রাজি নন প্রার্থীরা। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও নীরব ভোটাররাই হবেন জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে এবারের নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তিন প্রার্থী। এরমধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ, জামায়াত ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল ও হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওলানা জহুরুল ইসলাম আজিজী।
অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তিন প্রার্থী। এরমধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিজিএমইএ’র সভাপতি, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-কোষাধ্যক্ষ ও চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, জামায়াত ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের আমির আইনজীবী রুহুল আমিন ও হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি হাসানুজ্জামান সজীব।
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তারা সবাই মাঠে সক্রিয় থাকলেও প্রচারণায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, চায়ের দোকান ও জনপদে সরব হয়ে উঠছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর জেলার দুই সংসদীয় আসনে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই জমে উঠেছে ভোটের লড়াই। বিএনপি তাদের হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া, তেমনি নতুন ইতিহাস গড়তে চায় জামায়াত।
মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের বাইরে থাকা ভোটাররা। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা। দলীয় প্রার্থী না থাকায় এই ভোটারদের একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাতে মরিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
চুয়াডাঙ্গা শহরের এক ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দল নেই, তাই ভাবছি কাকে ভোট দিলে এলাকার জন্য ভালো হবে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।
একই ধরনের কথা শোনা গেলো আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী গ্রামেও। সেখানকার এক ভোটার বলেন, তিন প্রার্থীর মধ্যে কাউকে না কাউকে ভোট দিতে হবে। কিন্তু কাকে দেব, এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় আছি।
চুয়াডাঙ্গা শিক্ষাবিদ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বলেন, এটা আসলে নিজস্ব ভোটব্যাংকের নির্বাচন নয়, এটা মন জয়ের নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে কে কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন, সেটাই ফল নির্ধারণ করবে।
চুয়াডাঙ্গার বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল হক স্বপন বলেন, চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে এবারের জয়-পরাজয়ে নিয়ামক ভূমিকায় থাকবে ভাসমান ভোটার। এছাড়াও ব্যক্তিগত ইমেজ, জনসম্পৃক্ততাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। শুধুমাত্র দলীয় ভোট ব্যাংক দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া যাবে না। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যায়, সেটাও হতে পারে জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট।
চুয়াডাঙ্গা-১
আলমডাঙ্গা উপজেলা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসন। এটি একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও ২০০৮ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। তবে পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ আসনে জয়ী হন।
তবে এবার এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ। তিনি নির্বাচিত হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গণসংযোগে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আমরা শুধু নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছি না, সব দলের এমনকি নির্দলীয় ভোটারদেরও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ভোট কাকে দেবেন সেটাই মুখ্য নয়, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ৭০-৮০ শতাংশ ভোট পড়লেই সেটাই হবে বড় সাফল্য।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। তরুণ এই নেতা মাঠে নামার পর ভোটের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে বলে মত ভোটারদের।
মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, দল-মত নির্বিশেষে আমরা সাধারণ ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। চুয়াডাঙ্গাকে একটি রোল মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ মানুষের উন্নয়নে কাজ করবো।
এছাড়া হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী জহুরুল ইসলাম আজিজী বিকল্প রাজনীতি ও আদর্শিক অবস্থানের কথা সবার কাছে তুলে ধরছেন।
তিনি বলেন, বড় দলগুলোর রাজনীতির বাইরে গিয়ে ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তির নেতৃত্ব’ দেওয়ার আশ্বাস আমরা দিচ্ছি। এছাড়া তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি। ভালো কিছু হবে, ইনশাআল্লাহ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা হাতপাখার ওপর ভরসা রাখবে, এটা আমার বিশ্বাস।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা-১ (সদর ও আলমডাঙ্গা) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৩ হাজার ৭১৮ জন। যেখানে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০৪ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন। এই আসনে ৩ জন প্রার্থী লড়ছেন।
চুয়াডাঙ্গা- ২
দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনটিকে জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে ধরা হয়। অতীতে এখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই জয় পেয়েছে। এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি নির্বাচিত হলে শিল্প, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য আয়কর আইনজীবী রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সাংগঠনিক কাজ করে আসছেন। ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় এই নেতাকে হারানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজিএমইএয়ের সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি ক্লিন ইমেজের মানুষ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণে অভ্যস্ত তিনি।
মাহমুদ হাসান খান জানান, নির্বাচিত হলে এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান, খাদ্য হিমাগার, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ ও বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন তিনি। পাশাপাশি রাস্তাঘাটসহ সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমিন। আওয়ামী লীগের সকল বাধা উপেক্ষা করে ২০১০ সাল থেকে তিনি এ আসনে কাজ করছেন। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় অবস্থান করে দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে হারানো কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল।
রুহুল আমিন বলেন, এই জনপদের মেঠো পথেই আমার বেড়ে ওঠা। সঙ্গত কারণেই আমার জানা আছে এখানকার মানুষের চাওয়া-পাওয়া। তারা দু’মুঠো মোটা চালের ভাত আর নিরাপদ জীবন চায়। আমি তাদের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এই জেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্থলবন্দর বাস্তবায়ন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার উন্নয়ন, লুটপাটের রাজনীতি বন্ধ, চুয়াডাঙ্গা-কালীগঞ্জ সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আধুনিকায়নের মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ, পতিত জমি প্রকৃত হকদারদের প্রদান, দর্শনাকে উপজেলায় উন্নীতকরণ, একটি সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ সার্বিক বিষয়ে কাজ করতে চাই।
আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী হয়েছেন হাসানুজ্জামান সজীব। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের হাতেই বড় ফয়সালা। দুর্নীতি চ্যাম্পিয়নসহ নানা কারণে বড় দলগুলোর ওপর সাধারণ ভোটারদের আস্থা কম। আমি নির্বাচিত হলে- দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজমুক্ত একটা সমাজ গড়তে চাই।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৩৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩১ জন, নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন।
এফএ/এমএস