সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত উৎসে করের হার আইন অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকেই ১০ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। তবে তা কার্যকরের জন্য সরকারের সিস্টেমে ইনপুট দিতেই লেগে গেছে প্রায় তিন বছর!
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে হঠাৎ করেই সব বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা শুরু হলে বিষয়টি সামনে আসে। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েন গ্রাহকরা। কোনো নোটিশ বা প্রজ্ঞাপন ছাড়াই এমন পরিবর্তনে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ছোট বিনিয়োগকারীরা।
সঞ্চয় অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০১৬ সালে সঞ্চয়পত্রে যে কোনো অঙ্কের বিনিয়োগে ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। পরে ২০১৯ সালে পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ শতাংশ করা হয়। তবে ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ রহিত করে ২০২৩ সালে নতুন আয়কর আইন প্রণয়ন করা হলে সেখানে সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে আবারও এককভাবে ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়। এ আইনের গেজেট প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২২ জুন।
তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশের পরপরই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় ইনপুট না দেওয়ায় এতদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখানে অধিদপ্তরের কোনো গাফিলতি নেই। সিস্টেমে ইনপুট দেওয়ার দায়িত্বপালনকারীরা সেটি করেননি।
সঞ্চয়পত্রের সিস্টেমে ‘জালিয়াতির’ মাসুল গুনছেন সাধারণ গ্রাহক‘নীরবে’ বাড়ানো হলো সঞ্চয়পত্রের উৎসে করসঞ্চয়পত্র কেনার শর্ত কী, কারা কিনতে পারেন?
সম্প্রতি আয়কর রিটার্ন সংক্রান্ত কার্যক্রম করতে গিয়ে বিষয়টি সামনে আসে। কারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সফটওয়্যারে উৎসে কর ১০ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও সঞ্চয়পত্রের সিস্টেমে তা ভিন্ন ছিল। দুই জায়গায় ভিন্ন হার থাকায় জটিলতা দেখা দেয়। পরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সিস্টেমে ইনপুট দেওয়ার মাধ্যমে সবার ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর করা হয়েছে। জানান সঞ্চয় অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।
তিনি দাবি করেন, এতে গ্রাহকের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি, বরং এতদিন কম হারে কর কাটার কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
সিস্টেমে ইনপুট দেওয়ার দায়িত্ব কার? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এটি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়, সম্পূর্ণ সরকারের অধীনেই রয়েছে। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবাস প্লাস প্লাস-এর মাধ্যমে এ কাজ করা হয়। এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকারি লেনদেন, বাজেট, হিসাবরক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
আইন অনুযায়ী কর কার্যকর হলেও, তা বাস্তবায়নে তিন বছর দেরি এবং কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে করহার বাড়ানোর ফলে আস্থা সংকটে পড়ছেন বলে মনে করছেন সঞ্চয়পত্রের ছোট বিনিয়োগকারীরা। তারা বলছেন, ছোট বিনিয়োগকারীদের ওপর কর বাড়ানো হলো চুপিসারে, আর বড় বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন নেই। এটা কি তেলা মাথায় তেল দেওয়ার মতো অবস্থা নয়?
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ব্যাংক হিসাবে মুনাফা কমে যাওয়ায় চমকে ওঠেন অনেক ছোট বিনিয়োগকারী। এমন একজন রাজধানীর শাহনাজ পারভীন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তার সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ থেকে তিনি ২ হাজার ৭৩৬ টাকা মুনাফা পেয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই বিনিয়োগ থেকে পেয়েছেন ২ হাজার ৫৯২ টাকা।
ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে যেখানে আগে ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হতো, এখন সেখানে ১০ শতাংশ কাটা হচ্ছে। কোনো ঘোষণা না দিয়ে, কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না করে নীরবে নিয়ম বদলে ফেলায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান রামপুরার বাসিন্দা আয়েশা। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তার মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮২৪ টাকা, যা জানুয়ারিতে নেমে এসেছে ১ হাজার ৭২৮ টাকায়। ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের নির্দেশে এখন সব বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হচ্ছে।
ছোট বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়পত্র ছিল মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের ভরসা। পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে কম উৎসে কর ছিল এ খাতে বিনিয়োগের বড় প্রণোদনা। কিন্তু নীরবে সেই সুবিধা তুলে নেওয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাও মনে করছেন ছোট-বড় সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা ঠিক হয়নি। আগে ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎস কর ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, এটাই ভালো নিয়ম ছিল।
এ বিষয়ে সঞ্চয় অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, সঞ্চয়পত্রে যাদের ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ রয়েছে, তারা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। তারা অনেক কষ্ট করে অর্থ সঞ্চয় করেন, সঞ্চয়পত্র কেনেন। তাদের একটু বাড়তি সুবিধা দিলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে না, বরং সেটাই ন্যায়সংগত হবে। আমি মনে করি ছোট বিনিয়োগকারীদের উৎসে কর ৫ শতাংশ এবং বড় বিনিয়োগকারীদের উৎসে কর ১০ শতাংশ করাটাই যুক্তিসংগত ছিল।
সঞ্চয়ত্রের উৎসে কর ১০ শতাংশ করা সংক্রান্ত আইন ২০২৩ সালে করা হয়। এরপরও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন ঢালাওভাবে ১০ শতাংশ উৎস কর কাটা হচ্ছে? জাগো নিউজের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হয় জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগমকে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে, আমরা সেভাবে কাজ করেছি।’
সিস্টেমে ইনপুট দিতে তিন বছর লেগে যাওয়া কি স্বাভাবিক ঘটনা? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না না এটা লাগে না। আমরা আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী কাজ করছি।’
এমএএস/এএসএ