দাবা। শুধু একটি খেলা নয়। বুদ্ধি, কৌশল ও দূরদর্শিতার প্রতীকও। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা দুই মাত্রার দাবা বোর্ড এখন নতুন রূপ ধারণ করেছে-যাকে বলা হচ্ছে ত্রিমাত্রিক দাবা (থ্রি-ডি চেস)।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, ত্রিমাত্রিক দাবা আসলে কী? শুধুই কল্পবিজ্ঞানের বিষয়? নাকি ভবিষ্যৎ চিন্তাধারার প্রতিফলন?
এই লেখায় ত্রিমাত্রিক দাবার ধারণা, সাধারণ দাবার সঙ্গে এর পার্থক্য এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ত্রিমাত্রিক দাবা কী?
ত্রিমাত্রিক দাবা খেলায় বোর্ড শুধু একটি সমতল স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং থাকে একাধিক স্তর। অর্থাৎ খেলাটি শুধু ডানে-বামে বা সামনে-পেছনে নয় বরং উপরে-নিচে স্তরেও বিস্তৃত হয়।
থ্রি-ডি দাবা ধারণাটি প্রথম জনপ্রিয় হয় বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি ও টেলিভিশন সিরিজে। বিশেষ করে Star Trek-এ প্রদর্শিত থ্রিডি দাবা বোর্ডের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সফটওয়্যার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এর বাস্তব রূপ তৈরি হয়।
এই খেলায় ঘুঁটিগুলোর চলাচল আরও জটিল, কারণ প্রতিটি ঘুঁটি একাধিক মাত্রায় চলতে পারে যা অনেকটা সিঁড়ির মতো। ফলে খেলোয়াড়কে শুধু একটি বোর্ড নয়, একসঙ্গে কয়েকটি বোর্ড কল্পনা করে চাল নির্ধারণ করতে হয়।
সাধারণ দাবা ও ত্রিমাত্রিক দাবার পার্থক্য
সাধারণ দাবায় আমরা একটি ৮×৮ বোর্ডে খেলি, যেখানে সব চাল একটি সমতলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ত্রিমাত্রিক দাবায় বোর্ড থাকে একাধিক স্তরে বিভক্ত, যা কৌশলগত চিন্তাকে বহুগুণ জটিল করে তোলে।
এটিকে একটি সিঁড়ির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সাধারণ দাবায় প্রতিটি ঘর একই সমতলে থাকে, কিন্তু থ্রিডি দাবায় প্রতিটি ঘর যেন একটি করে সিঁড়ির ধাপ। ফলে সমতল বোর্ডে চিন্তা করার তুলনায় এই সিঁড়ির মতো বোর্ডে চিন্তা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
এখানে প্রতিপক্ষ উপরের স্তর থেকেও আক্রমণ করতে পারে, আবার নিচের স্তরে লুকিয়েও প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে।
ধরা যাক, আপনি একটি সমান বোর্ডে দাবা খেলছেন। যদি হঠাৎ বোর্ডের কিছু অংশ উঁচু আর কিছু অংশ নিচু করে দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকের তুলনায় খেলা অনেক বেশি জটিল হয়ে যাবে। ঠিক সেইভাবেই থ্রিডি দাবা সাধারণ দাবার চেয়ে বেশি কঠিন ও কৌশলনির্ভর।
এই কারণে থ্রিডি দাবায় কল্পনাশক্তি ও স্থানিক (spatial) চিন্তার গুরুত্ব অনেক বেশি। একজন খেলোয়াড়কে একসঙ্গে বহু স্তরের অবস্থান কল্পনা করে ভবিষ্যৎ চাল নির্ধারণ করতে হয়, যা সাধারণ দাবার তুলনায় অনেক বেশি মানসিক সক্ষমতা দাবি করে।
ত্রিমাত্রিক দাবা ও বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আগের মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৬-১৭ সালের দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে ‘থ্রি-ডি দাবা থিওরি’ বেশ আলোচিত হয়। অনেকেই ট্রাম্পের ‘উচ্চ ও বহুস্তরবিশিষ্ট’ রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে ত্রিমাত্রিক দাবার তুলনা করেন। কারণ থ্রিডি দাবার মতোই তার রাজনৈতিক সমীকরণও জটিল এবং বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
ট্রাম্প যা করেন বা বলেন, তা অনেক সময় এলোমেলো, বিতর্কিত বা আত্মঘাতী মনে হয়। কিন্তু সমর্থকদের দাবি, এগুলো আসলে ট্রাম্পের গোপন, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ‘ত্রিমাত্রিক দাবা’ মতবাদটি মূলত একটি রাজনৈতিক ‘ব্যঙ্গাত্মক’ ধারণা।
বিশ্লেষকদের একটি দল এ মতবাদকে আধুনিক যুদ্ধ কৌশলের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, বর্তমানে আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের সামরিক বাহিনীকে তিনটি স্তরে ভাগ করে যুদ্ধের কৌশল সাজিয়ে থাকেন।
আকাশ-ভূমি এবং নৌ- এই তিন সেক্টরের সঙ্গে ত্রিমাত্রিক দাবা মতবাদের মিল রয়েছে। তিন ভাগে সামরিক বাহিনীকে ঢেলে সাজানো এবং প্রতি পক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সম্মিলিত আক্রমণ সাজানোর প্রতীক হিসেবে থ্রি-ডি দাবার উল্লেখ করেছেন।
আধুনিক বিশ্বে রাজনীতি আগের মতো সরাসরি দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে রাজনীতি পরিচালিত হয় বহু স্তরে-অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, কূটনীতি, প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধ। এই বাস্তবতাকে ব্যঙ্গ করে ত্রিমাত্রিক দাবার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, দৃশ্যমান পদক্ষেপের অন্তরালে থাকে অদৃশ্য মুভমেন্ট আর কৌশল।
একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। বিভিন্ন কায়দায় ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরেও যখন মাদুরোকে নিজ শিবিরে ভেড়াতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র তখন দেশটিতে সরাসরি অভিযান চালায় ট্রাম্প প্রশাসন। ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসুলেট রিজলভ’ পরিচালনা করে মার্কিন ‘ডেল্টা ফোর্স’। ডেল্টা ফোর্সের সঙ্গে এ অভিযানে মার্কিন এফবিআই এবং সিআইএ জড়িত ছিল।
অভিযানের আগেই পেন্টাগন থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়। একটি বিমানবাহী রণতরি, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এক ডজনের বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ মোট ১৫ হাজারের বেশি সেনা ওই অঞ্চলে অবস্থান নেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলোকে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ বলা হলেও বাস্তবে এগুলোই ছিল মূল সামরিক প্রস্তুতি।
সাড়ে ৪ ঘণ্টার এ কমান্ডো অভিযানের শুরু হয় ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে। রাশিয়ার দেওয়া এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ‘এস-৩০০’ তখন ইনএক্টিভেট ছিল।
এই অভিযানে ২০টি ঘাঁটি থেকে ১৫০টির বেশি আকাশযান অংশ নেয়, যার মধ্যে এফ-৩৫, এফ-২২ এবং বি-১ বোমারু বিমান ছিল। মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভেনেজুয়েলার আকাশে প্রবেশ করে একের পর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুহুর্মুহু বোমা হামলা চালায়।
এরপর মাদুরোর ভবনে ‘ব্ল্যাক হক স্টিলথ’ হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে নেমে আসে কমান্ডোরা। নির্দিষ্ট একটি কক্ষ থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে টেনে হিঁচড়ে হেলিকপ্টারে তোলা হয়। মাদুরো দম্পতিকে বহন করা হেলিকপটারটি দ্রুত গতিতে উড়ে আসে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন করা ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী।
এরপর সে যুদ্ধজাহাজে করে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। এ অপারেশনটি সফলভাবে পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিল নৌ-বিমান এবং সামরিক কমান্ডো বাহিনী যা ‘থ্রি-ডি’ দাবা মতবাদের বেশ মিল রয়েছে।
থ্রি-ডি দাবা ও মানব মস্তিষ্ক
থ্রি-ডি দাবা মানব মস্তিষ্কের স্থানিক কল্পনাশক্তি ও বহুমাত্রিক চিন্তাকে সক্রিয় করে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের খেলা মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে।
আজকের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্স যেভাবে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে সেখানে থ্রি-ডি চিন্তার গুরুত্ব অপরিসীম। থ্রি-ডি দাবা খেলোয়াড়কে শুধু বর্তমান অবস্থান নয় বরং ভবিষ্যতের বহু সম্ভাব্য অবস্থান একসঙ্গে ভাবতে শেখায়।
থ্রি-ডি দাবা আমাদের শেখায়, কীভাবে একই সমস্যাকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। এটি শুধুমাত্র খেলাধুলার ক্ষেত্রেই নয়, বরং শিক্ষা, ব্যবসা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের জন্য থ্রি-ডি দাবা চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গঠনে যারা বহুস্তরীয় চিন্তা করতে পারবে, তারাই বাস্তব জীবনে এগিয়ে থাকবে।
সূত্র: ভাইস/ফিদে/দ্য গার্ডিয়ান
কে এম