সব ক্ষেত্রেই এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া। নির্বাচনেও এই ছোঁয়া লেগেছে প্রায় এক যুগ। তবে এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাজনৈতিক দল ও নেতারা তাদের সভা-সমাবেশসহ প্রতিটি মুহূর্ত ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। ব্যবহার করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (এআই)। প্রচারণার জন্য তৈরি করছেন এআইনির্ভর কন্টেন্ট। তবে সেই ‘এআই’ এবারের নির্বাচনের ডিজিটাল প্রচারণায় নতুন শঙ্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে- তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার আশীবার্দ না অভিশাপ- এমন প্রশ্নও উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এআইনির্ভর কন্টেন্ট। মাইক্রো-টার্গেটিং ও শর্ট ভিডিওর ব্যবহারও এবার নতুত্ব এনেছে। হ্যাকিং, ভুয়া কন্টেন্ট ও ডিপফেক- নির্বাচনের আগে তৈরি করেছে গভীর শঙ্কা। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৮০ শতাংশ ভিডিও ও ফটোকার্ডই ভুয়া। তবে নির্বাচনক সামনে রেখে দলগুলোর পক্ষ থেকেও ডিজিটাল অপপ্রচার রোধে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
দেশের সব খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলও এর বাইরে নয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত তাদের প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক পেজ থেকে প্রতিটি দলের সভা-সমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে। ভোট চেয়ে নানা ধরনের ফটোকার্ড শেয়ার করছেন প্রার্থীরা। জনসংযোগের প্রতিটি মুহূর্তই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন তারা।
আরও পড়ুনজামায়াত আমিরের এক্স হ্যান্ডেল হ্যাক, দলের নিন্দাজামায়াত আমিরের এক্স পোস্টের প্রতিবাদে ঢাবিতে ঝাড়ু মিছিলহ্যাক হওয়া পোস্টে কোনো মা-বোন কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি
তবে ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার ও ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে সহিংসতা। তৈরি করছে বিভ্রান্তি। সর্বশেষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের এক্স ও টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া প্রতিনিয়তই নির্বাচনে থাকা দলগুলো নিয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চলছে। কেউ ছড়াচ্ছে এআই ভিডিও, কেউবা ভুয়া ফটোকার্ড। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফটোকার্ডকে নকল করেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
জানতে চাইলে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণা ও অপপ্রচার—দুটোই ব্যাপকভাবে হচ্ছে। অনলাইন এখন মানুষের কাছে পৌঁছানোর একটি স্বাভাবিক ও কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে অপপ্রচার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, যা উদ্বেগজনক। এটাকে আশীর্বাদ না অভিশাপ—এভাবে বড় টার্মে দেখার চেয়ে নৈতিকতার জায়গাটায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার করা দোষের নয়, কিন্তু অপব্যবহার করা অন্যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই নৈতিকতা বজায় রাখতে পারছি না।’
প্রায় ৮০ শতাংশ ভিডিও ও ফটোকার্ডই ভুয়া উল্লেখ করে সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ও কন্টেন্ট ছড়ানোর ঘটনা চোখে পড়ার মতো। দলীয়ভাবে বা সমর্থকদের মাধ্যমে এসব ফেক ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা খুবই অন্যায় হলেও বাস্তবতা হচ্ছে—এগুলো ঘটছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিও ও ফটোকার্ডগুলো দেখা যাচ্ছে, তার বড় একটি অংশই ভুয়া। তাই এসব কনটেন্ট দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আরও পড়ুননির্বাচনের আগে এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল যে সব বিশ্বনেতারআমিরের পর এবার জামায়াত সেক্রেটারির এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকজামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক, ডিবির হাতে আটক বঙ্গভবন কর্মকর্তা
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিজিটাল প্রচারণা নিজে থেকে আশীর্বাদ বা অভিশাপ—দুটোর কোনোটাই নয়। এটি পুরোপুরি নির্ভর করবে আপনি কীভাবে ব্যবহার করছেন তার ওপর। ইতিবাচকভাবে করলে ডিজিটাল প্রচারণা একসঙ্গে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানোর বড় সুযোগ তৈরি করে, যা আগে সম্ভব ছিল না। পোস্টার বন্ধ হওয়া পরিবেশবান্ধব একটি ইতিবাচক দিক। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে খুব দ্রুত মিস-ইনফরমেশন ও ম্যাল-ইনফরমেশন ছড়ানোর ঝুঁকিও আছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এআইনির্ভর ভুয়া কন্টেন্ট ও সাইবার হামলার মাত্রা আমাদের ধারণার বাইরে চলে গেছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি), আইসিটি ডিভিশন ও ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির অধীনে ২৪ ঘণ্টা কাজ করা টিম সক্রিয় রয়েছে। আমাদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টির মতো কন্টেন্ট রিপোর্ট করতে হচ্ছে, যার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ কন্টেন্ট টেকডাউন করছে।’
তিনি বলেন, ‘ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি এবং পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলোও ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। আমাদের ২১ জন ইঞ্জিনিয়ার, ফ্যাক্ট-চেকার, সেন্টিমেন্ট অ্যানালিস্ট ও ফুল স্ট্যাক ডেভেলপারদের একটি টিম কাউন্টার কন্টেন্ট তৈরিতে নিয়মিত কাজ করছে। তবে আক্রমণের পরিমাণ এত বেশি যে সব কন্টেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে সরানো সম্ভব হচ্ছে না।’
অপপ্রচার শনাক্ত করছে বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠাননির্বাচনের আগে একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার ও এআই ভিডিও শনাক্ত করছে। দেখা যাচ্ছে, ভুয়া প্রচারণার শিকার হচ্ছে সব দলই। নির্বাচনে থাকা প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ভুয়া প্রচারণার শিকার হচ্ছেন। ছাত্র-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও এই অপপ্রচার থেকে বাদ পড়ছেন না।
ফ্যাক্টচেকিং বিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক দ্বারা স্বীকৃত দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচ। নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু অপপ্রচার নিয়ে ফ্যাক্ট চেক করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৫৫ লাখ, যা ভুয়া। নারীকে পেটাচ্ছে বিএনপি নেতা- এমন দাবি করে ভারতের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। এমন বিষয়ও শনাক্ত করেছে তারা। এছাড়া জামায়াতের হামলায় বিএনপি নেত্রী আহত হওয়ার একটি ভিডিও প্রচার হয়, যা আসলে ভুয়া। জামায়াতকে জড়িয়ে যমুনা টিভির নামে একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার হয়েছে, এমন ফ্যাক্টচেকও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বুম বাংলাদেশ নামের একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টচেকিংয়ে দেখা গেছে, জামায়াতকে ভোট না দিলে হিন্দুদের ভারতে পাঠানো হবে বলে প্রচারিত ভিডিওটি আসল নয় বরং এআই প্রযুক্তিতে এটি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামাজের ভিডিওটি সত্যি নয় বরং এআই প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এমন বেশ কিছু বিষয়ে ফ্যাক্টচেক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আরও পড়ুনমোবাইলে বিকৃত ভিডিও দিয়েই শুরু হতে পারে আগামীর যুদ্ধগুজব প্রতিরোধে ডিজিটাল নাগরিকভারতের ৭৩ গণমাধ্যমের ১৪০টি প্রতিবেদনে অপতথ্যের প্রমাণ
গত জানুয়ারি মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৫৭৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার, যা এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্তের পরিমাণ। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৪৫২টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ বলছে, জানুয়ারিতে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (৪৬৯) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৮১ শতাংশ।
রিউমর স্ক্যানার তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারিতে এ সংক্রান্ত ২৭১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে গণভোট নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১৭টি অপতথ্য।
ভার্চুয়াল জগতে সাধারণ মানুষের করণীয়কোনো ছবি বা ভিডিও দেখলেই সহজে তা বিশ্বাস করা উচিত নয়। ছবিটির উৎস সম্পর্কে অবগত হতে হবে। ছবিটি কে শেয়ার করেছে, কোন মাধ্যমের সূত্র থেকে এসেছে তা বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের প্রথম সারির কোনো গণমাধ্যমের প্রকৃত লোগো সংবলিত ছবি কি না, ছবিটি বিশ্বাসযোগ্য কোনো গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে কি না, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এটিও মনে রাখতে হবে যে বর্তমানে ফেসবুকে গণমাধ্যমগুলোকে নকল করেও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। ভালো করে দেখলে বা যাচাই করতে চাইলে প্রাথমিকভাবে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায় কন্টেন্টটি বিকৃত কি না। একইভাবে এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিও সম্পর্কে খোলা চোখে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। ফলে যাচাই ছাড়া কোনো ছবি বা ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার না দেওয়াই উত্তম।
করণীয় প্রসঙ্গে ডিকোডস ল্যাব লিমিটেডের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেক সময় এগুলো সত্য না ভুয়া—তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্টে ছোট আকারে এআইর লোগো বা আইকন দেওয়া থাকে, যা দেখে বোঝা যায় এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি। তবে অনেক সময় এসব চিহ্ন থাকে না, তখন সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
আরও পড়ুন২০২৫ সালে রেকর্ড ৪১৯৫ ভুল তথ্য শনাক্তকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সাংবাদিকতার জন্য আশীর্বাদ নাকি হুমকি?বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথিত ‘র’ কর্মকর্তার সাক্ষাতের ভাইরাল ছবিগুলো ভুয়া
এআই কন্টেন্ট শনাক্ত করার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে থার্ড পার্টি কিছু সফটওয়্যার ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— কোনো ছবি এআই দিয়ে তৈরি কি না তা যাচাই করতে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যায়। আবার ভিডিও যদি ডিপফেক সংক্রান্ত হয়, তাও কয়েকটি ওয়েবসাইটে ভিডিওর লিংক দিয়ে যাচাই করা সম্ভব।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘চোখে দেখেই এআই দিয়ে তৈরি কন্টেন্ট শনাক্ত করার নির্ভরযোগ্য কোনো উপায় নেই। কিছু বিশেষজ্ঞ সূক্ষ্মভাবে দেখে ধারণা করতে পারলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা প্রায় অসম্ভব। তাই যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ।’
সাধারণ মানুষের করণীয় বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো ছবি বা তথ্য সত্য না মিথ্যা—এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ আমাদের নির্ধারিত ইমেইল ঠিকানাগুলোতে যোগাযোগ করলে অল্প সময়ের মধ্যেই ফ্যাক্ট-চেক করে জানানো হবে।’
আইসিটি সচিব বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভায়োলেট না হলে তারা অনেক সময় কন্টেন্ট টেকডাউন করে না। ইচ্ছাকৃতভাবে বানান পরিবর্তন, প্রতীক ব্যবহার বা বিকৃত হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে ভুয়া কন্টেন্ট ছড়ানো হচ্ছে, ফলে টেকডাউন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ছে। বিটিআরসি, ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি ও সাইবার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের মাধ্যমে একাধিক ফ্লোতে রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে। সরকার যে কোনো ধরনের মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, হেট স্পিচ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’
আরও পড়ুনভোটে এআই’র অপব্যবহার রোধে কর্মপন্থা ঠিক করে সমন্বিত সেল করা হবেভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা আমাদের করণীয়সত্যের সন্ধানে এআই, বিভ্রান্তি না মুক্তি?
যা বলছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাতথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণায় এআইনির্ভর কন্টেন্ট, মাইক্রো-টার্গেটিং ও শর্ট ভিডিওর ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে হ্যাকিং, ভুয়া কন্টেন্ট ও ডিপফেকের ঝুঁকিতে এই প্রচারণা একই সঙ্গে সুযোগ ও হুমকি হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা থাকলে ডিজিটাল প্রচারণা আশীর্বাদ, না থাকলে তা সরাসরি গণতন্ত্রের জন্য অভিশাপ।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনে এখনো হাই-লেভেলের এআই ডিপফেক আমরা দেখিনি। যেগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো মূলত অ্যামেচার লেভেলের, দেখলেই বোঝা যায় এআই দিয়ে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রাজিলের মতো দেশে যেভাবে প্রায় নিখুঁত ডিপফেক দেখা গেছে, সে ধরনের ল্যাব সুবিধা বাংলাদেশে নেই। তবে মিডিয়া লিটারেসি কম হওয়ায় গ্রামাঞ্চলসহ অনেক মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা তথ্য সহজেই বিশ্বাস করছে, যা উদ্বেগজনক।’
তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আমরা যতো আশঙ্কা করেছিলাম, এখন পর্যন্ত ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। নির্বাচনের মাঠে যতটা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি দেখা যাচ্ছে, ততটা এখনো ডিজিটালি শুরু হয়নি। এটা একটা পজিটিভ দিক বলতে পারেন। বাকি ৮ থেকে ৯ দিন যদি এরকম থাকে, তাহলে মোটামুটি এটা ম্যানেজেবল।’
হ্যাকিং বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর ডিজিটাল সিকিউরিটি বড় একটি চ্যালেঞ্জ। কেউ কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি করলে সেটি কীভাবে রিকভার হলো এবং সেটার প্রমাণ কী—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। না হলে হ্যাকের দাবি নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।’
আরও পড়ুনসোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভুয়া ফটোকার্ড’ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেমানুষকে ভুল তথ্য বিশ্বাস করা থেকে বিরত রাখা সম্ভব?ফেসবুকে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে মেটাকে পদক্ষেপ নিতে বললেন ড. ইউনূস
ডিজিটাল প্রচারণায় ব্যয়নির্বাচনে প্রার্থী ও দলগুলোর ডিজিটাল প্রচারণার ব্যয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশনেও (ইসি) আলাদা করে এই ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রতি আসনের সব প্রার্থী মিলেও যদি এক লাখ টাকা করে ব্যয় করেন, সে হিসাবে এই ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় তিন কোটি টাকা।
জানা গেছে, প্রতিটি দল তাদের ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট বুস্ট করতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রেখেছে। সে অর্থ হিসাবে আনলে নির্বাচনের ডিজিটাল প্রচারণায় বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে তা স্পষ্ট।
ডিজিটাল প্রচারণায় ব্যয় সম্পর্কে অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘ডিজিটাল প্রচারণার ব্যয় নির্দিষ্ট করে বলা খুবই কঠিন। কোন প্ল্যাটফর্ম, কতদিন, কত এলাকায়, কয়টা পেজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারণা হচ্ছে—এসব না জানলে কোনো হিসাব করা সম্ভব নয়। বাস্তবে দেখা যায়, এই ব্যয় নির্বাচন কমিশনের কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে থাকে না।’
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলেন, ‘ডিজিটাল প্রচারণায় ব্যয় তুলনামূলক কম দেখালেও বাস্তবে এর প্রভাব বড়। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপন, ভিডিও কন্টেন্ট ও টার্গেটেড মেসেজিং এখন মূল হাতিয়ার। এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা ফেসবুক, ইউটিউব ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটার ধরতে। ফলাফল হলো—মাঠের প্রচারণার পাশাপাশি ডিজিটাল খরচ নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দলগুলো সামাজিকমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ভিডিও, ফেসবুক প্রচারণায় লাখ টাকা থেকে কয়েক মিলিয়ন টাকার ব্যয় করছে বলে তথ্য এসেছে; যেমন বিএনপি ফেসবুকে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা খরচ করেছে। এবার ডিজিটাল প্রচারণায় ব্যয় সাধারণ প্রচারণার তুলনায় বেশি নজরে পড়ছে।’
ইএইচটি/এমএমএআর/