১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন পুরো বাংলাদেশ যেন এক বিশাল নির্বাচনী ময়দান। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, অলিগলি, শহরের মোড়—সবখানেই একটাই সুর, একটাই ডাক: ভোট। কোথাও মাইকে ভেসে আসছে গানের ছন্দে কাতর আবেদন— “মাগো বোন গো, দাদাগো দাদি গো, ভাইয়া গো…”—আবার কোথাও উঠান বৈঠকে প্রার্থীর বিনয় কণ্ঠে প্রতিশ্রুতির বন্যা। এই দৃশ্য কেবল নির্বাচনী প্রচারণার রঙিন ছবি নয়; এটি স্পষ্ট করে বলে দেয়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন ভোটারের মূল্য কতটা অপরিসীম।
আজ ভোট চাইতে প্রার্থীরা কণ্ঠ নরম করছেন, হাত জোড় করছেন, কখনো গান, কখনো কবিতা, কখনো আবেগের আশ্রয় নিচ্ছেন। এই কাতরতা আসলে ক্ষমতার নয়; এটি ভোটারের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাপ্রার্থীর অসহায়ত্বের প্রকাশ। কারণ গণতন্ত্রে ক্ষমতার চাবিকাঠি কারও হাতে নয়—তা থাকে ব্যালটের ভেতর, একজন সাধারণ নাগরিকের আঙুলে।
এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষটির একটি ভোট আর দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির—প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান উপদেষ্টার—একটি ভোটের ওজন এক ও অভিন্ন। শারীরিক প্রতিবন্ধী, দরিদ্র, অশিক্ষিত, প্রান্তিক কিংবা সমাজের সবচেয়ে সম্পদশালী—সবাই এক ভোটের মালিক। এই সমতার নামই গণতন্ত্র। আর এই সমতাই প্রার্থীদের বাধ্য করে ভোটারের দরজায় গিয়ে কণ্ঠ নামাতে।
ভোট কেবল একটি কাগজে সিল মারা নয়। ভোট মানে ক্ষমতার হিসাব বদলে দেওয়া। ভোট মানে শাসককে জবাবদিহির আওতায় আনা। ভোট মানে নাগরিক হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করা। তাই যখন প্রার্থীরা গান গেয়ে, আবেগ ছুঁয়ে ভোট চাইছেন, তখন আসলে তারা স্বীকার করছেন—এই রাষ্ট্রে শেষ কথা বলার অধিকার ভোটারের।
এই কারণেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একটি সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি একটি রাজনৈতিক মোড়, অনেকটাই গণভোটের সমতুল্য। ‘হা ভোট’ মানে নাগরিক হিসেবে কিছু মৌলিক অধিকার নতুন করে প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যে লাগাম টানা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য আনা—এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে এই ভোট গভীরভাবে জড়িত। তাই এই প্রশ্নে ‘হা ভোট’-এর কোনো বিকল্প নেই।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মূল নির্বাচনে ‘না ভোট’ ব্যবস্থার সুযোগ। কোনো প্রার্থী যদি চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি, মাদক বা সন্ত্রাসের প্রশ্রয়দাতা হন, ভোটার চাইলে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন। এটি ভোটারের ক্ষমতাকে আরও অর্থবহ করে তোলে। তবে গণভোটের ক্ষেত্রে ভোট দেওয়াই নাগরিক দায়িত্ব; কারণ সেখানেই ভবিষ্যৎ অধিকারগুলোর ভিত্তি স্থাপিত হয়।
এই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথেই একটি বড় সতর্কবার্তা আছে—শেখ হাসিনার মতো আর কোনো নব্য স্বৈরাচারের জন্ম যেন না হয়। ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে, ভোটাধিকার উপেক্ষিত হলে কিংবা ভুয়া হলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, আর সেই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারে রূপ নেয়।
এই নির্বাচন আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
বৈষম্যের না সমতার?
সত্যের না মিথ্যার?
আদর্শের না ভণ্ডামির?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখা হবে ব্যালট পেপারে। সেখানেই নির্ধারিত হবে—রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য, নাকি নাগরিক রাষ্ট্রের করুণার ওপর নির্ভরশীল থাকবে।
আরেকটি কথা স্পষ্ট করে বলা জরুরি। কোনো কিছুর বিনিময়ে ভোট দেওয়া—টাকা, উপহার কিংবা লোভনীয় প্রতিশ্রুতি—নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়। এর মানে আপনি শুধু ভোট নয়, আপনার ভবিষ্যৎ বিক্রি করছেন। এর বিনিময়ে আপনি পাঁচ বছর শোষিত হবেন, নিপীড়িত হবেন, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন।
স্বাধীনভাবে, কোনো লেনদেন ছাড়া, সৎ ও যোগ্য মানুষকে ভোট দিলে আপনি পাঁচ বছর অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবেন। আর লোভের কাছে নত হওয়া মানে নিজেকে বিক্রি করে দেওয়া—গোলামির শিকল নিজের পায়ে নিজেই পরা।
একজন বিশ্বাসী নাগরিকের জন্য ভোট শুধু সাংবিধানিক অধিকার নয়, এটি নৈতিক দায়িত্বও। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে যে বিবেকের স্বাধীনতা দিয়েছেন, তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটে ভোটকক্ষে। সৎ ও যোগ্য মানুষকে ভোট দেওয়া একদিকে নাগরিক কর্তব্য, অন্যদিকে নেক কাজ। এতে আপনি শাসিত নন—মালিক হিসেবে নিজের অবস্থান দাবি করতে পারেন।
আজ প্রার্থীরা কাতর কণ্ঠে ভোট চাইছেন—এটাই প্রমাণ, ভোটারই আসল শক্তি। সুন্দর কথা, মিষ্টি ভাষা, গানের সুরে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের বিবেক দিয়ে ভাবুন। কে সৎ, কে যোগ্য, কে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করবে—তা বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিন।
১২ ফেব্রুয়ারি কোনো সাধারণ দিন নয়।
এটি অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন।
এটি গোলামি ছেড়ে মালিক হওয়ার দিন।
এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শপথের দিন।
সুতরাং কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়—বিবেকের স্বাধীনতায় স্বাধীনভাবে ভোট দিন।
কারণ গণতন্ত্র শুধু আমার বা আপনার নয়—গণতন্ত্র আমাদের সবার।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা। ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
এইচআর/জেআইএম