ফেব্রুয়ারি মাস বাঙালির চেতনায় এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এই মাস ভাষার মাস, যেখানে মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার গৌরবময় ইতিহাস একসূত্রে মিলিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে যে রক্ত ঝরেছিল, তার ধারাবাহিকতাতেই বাংলা আজ কেবল একটি জাতির ভাষায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি শক্তিশালী ভাষায় রূপ নিয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী নতুন স্বীকৃতি লাভ করে। একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে এসে বাংলা ভাষা আরও এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে।
বাংলা ভাষা তার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যার বিচারে বাংলা বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভাষাগুলোর অন্যতম, যা এর শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি ও প্রাণবন্ত ব্যবহারিক বিস্তারের পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভাষা হিসেবে বাংলার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে চলমান। একই সঙ্গে প্রবাসী বাঙালিদের হাত ধরে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ভিন্ন ভৌগোলিক পরিসরেও বাংলা ভাষা তার নিজস্ব উপস্থিতি ও পরিচয় বজায় রেখে চলেছে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র এবং লোকজ সংস্কৃতির বিস্তৃত ভাণ্ডারের মাধ্যমে বাংলা ভাষা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের চিন্তা, অনুভব ও চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এসেছে এবং আজও তা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক শক্তিশালী বাহক হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
ডিজিটাল যুগ মূলত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এক আধুনিক সভ্যতা, যেখানে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় কোনো ভাষার টিকে থাকা, বিকাশ ও প্রভাব অনেকাংশেই নির্ভর করে তার ডিজিটাল উপস্থিতি, ব্যবহারযোগ্যতা ও প্রযুক্তিগত অভিযোজনের সক্ষমতার ওপর। এক সময় বাংলা ভাষা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, উপযুক্ত সফ্টওয়্যার ও মানসম্মত লিপি ব্যবস্থার অভাবে ডিজিটাল পরিসরে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে সেই চিত্র দ্রুত ও ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউনিকোডের প্রবর্তন বাংলা ভাষার ডিজিটাল অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে, যার ফলে বাংলা লিপি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃতি লাভ করে এবং কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে সহজ ও সমন্বিত ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিকতায় আজ বাংলা কিবোর্ড, বিভিন্ন মানসম্পন্ন ফন্ট, বানান পরীক্ষক, টেক্সট থেকে কণ্ঠস্বর এবং কণ্ঠস্বর থেকে টেক্সটে রূপান্তরকারী প্রযুক্তি ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে, যা ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে আরও সহজ, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।
বাংলা ভাষা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এমন এক অমূল্য সম্পদ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় ইতিহাস। ডিজিটাল যুগ একদিকে যেমন এই ভাষাকে নানামুখী নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে, তেমনি অন্যদিকে তা বাংলা ভাষার বিস্তার ও বিকাশের জন্য উন্মুক্ত করেছে নতুন সম্ভাবনার বিস্তৃত দুয়ার। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির তাৎপর্যকে স্মরণ করে আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার শুদ্ধ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে ভাষার সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাংলা ভাষার বিস্তার ও ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে সুস্পষ্টভাবে আবির্ভূত হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহার অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই প্রবণতা দিন দিন আরও বিস্তৃত ও প্রভাবশালী রূপ নিচ্ছে। ব্যক্তিগত অনুভূতি ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা প্রকাশ থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক মতামত, সাহিত্যচর্চা এবং হাস্যরসাত্মক উপস্থাপন পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষা আজ একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ব্লগ, অনলাইন ম্যাগাজিন, ই বুক ও পডকাস্টের মতো আধুনিক মাধ্যমের মাধ্যমে বাংলা ভাষা নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভঙ্গি, সমকালীন বিষয়বস্তু ও বৈচিত্র্যময় অভিব্যক্তি নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলা ভাষাকে কেবল লিখিত রূপে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং ভিডিও, অডিও, অ্যানিমেশন ও গ্রাফিক্সের বহুমাধ্যমিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ভাষাটিকে আরও প্রাণবন্ত, আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তুলছে, ফলে সমসাময়িক পাঠক ও দর্শকের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ডিজিটাল যুগে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় বাংলা ভাষার গুরুত্ব নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে। অনলাইন ক্লাস, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ওপেন কোর্সওয়্যার ও শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে বাংলায় জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও প্রকৌশলের মতো বিষয়েও বাংলায় কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মাতৃভাষায় জ্ঞান অর্জনকে সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।একই সঙ্গে বাংলা ভাষায় গবেষণা ও তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হচ্ছে। উইকিপিডিয়ার বাংলা সংস্করণ, ডিজিটাল আর্কাইভ ও অনলাইন অভিধান এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল জগতে বাংলা ভাষার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তি ব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার ক্রমবর্ধমান আধিপত্য, দৈনন্দিন ব্যবহারে বাংলা ও ইংরেজির অতিরিক্ত মিশ্রণ এবং বানান ও ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে ক্রমাগত উদাসীনতা বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ ও ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলার পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ডিজিটাল ডেটার অভাব একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতার পাশাপাশিই সম্ভাবনার দিকটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক। যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিবান্ধব নীতি প্রণয়ন, মানসম্মত ও গবেষণাভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ এবং তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীল ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলা ভাষা বৈশ্বিক ডিজিটাল মানচিত্রে আরও সুদৃঢ় ও সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করতে পারে।
ভাষা কেবল মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামষ্টিক চেতনার বহনকারী শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলা ভাষা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এমন এক অমূল্য সম্পদ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের গৌরবময় ইতিহাস। ডিজিটাল যুগ একদিকে যেমন এই ভাষাকে নানামুখী নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে, তেমনি অন্যদিকে তা বাংলা ভাষার বিস্তার ও বিকাশের জন্য উন্মুক্ত করেছে নতুন সম্ভাবনার বিস্তৃত দুয়ার। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির তাৎপর্যকে স্মরণ করে আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার শুদ্ধ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে ভাষার সৌন্দর্য ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন থাকে। এই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই পারে বাংলাকে কেবল অতীতের গৌরবের স্মারক হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী ও সম্মানজনক বৈশ্বিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান জিআরপি ফাউন্ডেশন।
এইচআর/এমএস