বিশ্বে টেলিভিশনের ধারাবাহিক দর্শনের সূচনা ঘটে ১৯২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। সেদিন ব্রিটিশ আবিষ্কারক জন লোগি বেয়ার্ড লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে টেলিভিশনের প্রথম সর্বজনীন প্রদর্শনী করেন।
এই প্রদর্শনীতে তিনি গতিশীল ছবি প্রেরণের যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন এবং ইলেকট্রনিক সংকেতের মাধ্যমে ছবি ও শব্দ একসঙ্গে পাঠানোর ধারণা মানুষের সামনে তুলে ধরেন।
কারিগরি দিক থেকে এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। তবে বিশ্ব গণমাধ্যম ইতিহাসে এই দিনটিকেই টেলিভিশনের যাত্রার প্রতীকী সূচনা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখান থেকেই ধীরে ধীরে মানুষের দেখা, জানা এবং বোঝার ধরন বদলাতে শুরু করে।
টেলিভিশনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বিস্তারশুরুর পর খুব দ্রুত টেলিভিশন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। ১৯২৮ সালে জন লোগি বেয়ার্ড রঙিন সম্প্রচারের পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী করেন। ১৯৩০ সালে ইংল্যান্ডে টেলিভিশনে প্রথম নাটক সম্প্রচারিত হয়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু হয়।
এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক। এটিই টেলিভিশনে ব্যাপকভাবে লাইভ স্পোর্টস কভারেজ সম্প্রচারের প্রথম বড় উদাহরণ। যদিও সে সময় সাধারণ মানুষের ঘরে টেলিভিশন ছিল না, নির্দিষ্ট কিছু পাবলিক ভিউয়িং বুথে দর্শকরা সরাসরি অলিম্পিকের খেলা দেখার সুযোগ পান। এখান থেকেই টেলিভিশন কেবল প্রযুক্তি নয়, গণমানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠতে শুরু করে।
টেলিভিশনে প্রথম স্পোর্টস সম্প্রচারলাইভ স্পোর্টস সম্প্রচারের ইতিহাসে টেলিভিশন একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। এর কিছু উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলো
১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক গেমস, যা বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক হিসেবে সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়।১৭ মে ১৯৩৯ সালে নিউইয়র্কে কোলম্বিয়া বনাম প্রিন্সটন কলেজের বেসবল ম্যাচ সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম লাইভ স্পোর্টস সম্প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
একই বছরের আগস্ট মাসে প্রথম প্রফেশনাল মেজর লিগ বেসবল খেলাও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়, যা টেলিভিশনকে বাণিজ্যিক মিডিয়ায় রূপান্তরের পথে বড় ভূমিকা রাখে।
টেলিভিশনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো একক সেরা খেলোয়াড় নির্ধারণ করা কঠিন। তবে স্পোর্টস ও মিডিয়ার ঐতিহাসিক সংযোগের ক্ষেত্রে ১৯৩৬ অলিম্পিকে জেসি ওয়নসের একশ মিটার দৌড়ের জয়, কিংবা সেই অলিম্পিক ঘিরে তৈরি হওয়া দৃশ্য ও বর্ণনাগুলো আজও গণমাধ্যম ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
সুইডেনে টেলিভিশনের শুরুসুইডেনে টেলিভিশনের যাত্রা অন্যান্য পশ্চিমা দেশের তুলনায় কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। ২৯ অক্টোবর ১৯৫৪ সালে স্টকহোমভিত্তিক পরীক্ষামূলক টিভি ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রথম সম্প্রচার শুরু হয়। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সালে সরকারি টেলিভিশন সার্ভিস Swedish Radio Service TV আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এটি Swedish Radio TV এবং পরে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান Swedish Television বা এসভিটি হিসেবে গড়ে ওঠে। নিয়মিত নির্ধারিত সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৫৭ সালে এবং ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় চ্যানেল TV2 চালু হয়।
সুইডেনে বাণিজ্যিক টেলিভিশনের সূচনা ঘটে ১৯৮৭ সালে TV3 এর মাধ্যমে। যদিও এই চ্যানেলটি প্রযুক্তিগত কারণে লন্ডন থেকে সম্প্রচার শুরু করেছিল, তবু এটি সুইডিশ টেলিভিশন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাংলাদেশে টেলিভিশনবাংলাদেশে টেলিভিশনের ইতিহাস কেবল প্রযুক্তিগত নয়, গভীরভাবে সাংস্কৃতিকও। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি প্রথম সম্প্রচার শুরু করে ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে। প্রথম শিল্পী হিসেবে পর্দায় দেখা যায় ফেরদৌসি রহমানকে এবং বিটিভিতে প্রথম প্রচারিত গান ছিল ‘ঐ যে আকাশ নীল হল আজ’।
প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘একতলা ও দোতলা’ সম্প্রচারিত হয় ১৯৬৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশে রঙিন সম্প্রচার শুরু হয় ১ ডিসেম্বর ১৯৮০ সালে। বিটিভি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে দিনের খবর, সামাজিক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তথ্য ও সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে টেলিভিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। স্মৃতি, আবেগ ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে বিটিভি আজও গভীরভাবে যুক্ত।
টেলিভিশন শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম হিসেবে বিকশিত হয়েছে। জন লোগি বেয়ার্ডের ১৯২৬ সালের প্রদর্শনী থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী লাইভ স্পোর্টস সম্প্রচার এবং দেশভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্কের বিস্তার মানুষের জীবনধারা আমূল বদলে দিয়েছে। আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস উপলক্ষে ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, টেলিভিশন কেবল তথ্য ও বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও নাম।
পরিশেষে ভাবনার খোরাকএকশ বছর আগে টেলিভিশন আমাদের শিখিয়েছিল, এক জায়গায় বসে দূরের পৃথিবী দেখা যায়। ২১২৬ সালে এসে প্রশ্নটা আর কী দেখবে নয়, প্রশ্নটা হলো কীভাবে দেখবে। ভবিষ্যতের প্রজন্ম হয়তো আর পর্দার দিকে তাকাবে না, বরং পর্দাই তাদের চারপাশ ঘিরে ধরবে। দেয়াল, টেবিল, জানালা এমনকি নীরব বাতাসও তথ্য বহন করবে। দেখা আর শোনা আলাদা অভিজ্ঞতা থাকবে না। অনুভব করাই হয়ে উঠবে দেখার নতুন রূপ।
তারা হয়তো লাইভ ম্যাচ দেখবে না, ম্যাচের ভেতরে ঢুকে পড়বে। ক্যামেরা থাকবে না, থাকবে দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিহাস তারা দেখবে আর্কাইভে নয়, সময়ের পুনর্গঠনে। একাত্তর, উনিশশো ছত্রিশ কিংবা আজকের দিনটি তারা দেখবে বহু কণ্ঠের স্মৃতির সমষ্টি হিসেবে, একক বর্ণনা হিসেবে নয়।
তবু প্রযুক্তি যতই বদলাক, একটি প্রশ্ন একই থাকবে। কে নিয়ন্ত্রণ করছে এই দেখা। অ্যালগরিদম, নাকি মানুষ। মুনাফা, নাকি মঙ্গল। দ্রুততা, নাকি সত্য। ভবিষ্যতের প্রজন্ম যদি কেবল যা দেখানো হয় তাই দেখে, তবে পর্দা বদলালেও বন্দিত্ব বদলাবে না। আর যদি তারা শেখে প্রশ্ন করতে, তুলনা করতে, নীরবতার ফাঁক পড়তে, তবে নতুন মাধ্যম সত্যিকারের মুক্তির পথ খুলে দিতে পারে।
২১২৬ সালের টেলিভিশন হয়তো চোখে নয়, বিবেকে দেখা হবে। তখনও আমাদের দায়িত্ব আজকের মতোই থাকবে। কী দেখাই, কেন দেখাই, আর কাকে দেখাই। কারণ প্রযুক্তি কেবল একটি আয়না। সেই আয়নায় যে সমাজের প্রতিফলন পড়ে, সেটাই শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়ে থাকে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com
এমআরএম/এমএস