রাজনীতি

দলীয় কোন্দলে দুর্বল বিএনপির ঘাঁটি, শক্ত অবস্থানে জামায়াত

নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১০ আসন। বিএনপির ঘাঁটি খ্যাত এ আসনটি হাতছাড়া হওয়ার পথে। প্রায় দখলে নিয়েছে জামায়াত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাকি দখল নিশ্চিত হবে।

দ্বন্দ্বের শুরু সেই ২০০৬ সাল থেকে। তখন এই আসনের এমপি ছিলেন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া। উপজেলা চেয়ারম্যান মনোনয়ন নিয়ে তারই অনুসারী মোবাশ্বের আলম ভূইয়া ও নজির আহমেদ ভূইয়ার প্রতিযোগিতায় তিনি ঘি ঢালেন। নজির আহমেদ ভূইয়াকে মনোনয়ন দেন। সে সময় নেতাকর্মীদের কাউকে গড়ি দিয়ে, কাউকে টাকা দিয়ে নিজের পৃথক বলয় তৈরি করেন মোবাশ্বের ভূইয়া। সেই ক্ষোভে গফুর ভূঁইয়া তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাকে ‘কালো ছাগল’ আখ্যা দেন। এতে আগুনে তুষ দেওয়ার মতো দ্বন্দ্ব বাড়ে আরও।

সেই দ্বন্দ্বের সূত্র ধরেই ২০০৮ সালে মোবাশ্বের ভূইয়া আসনটির মনোনয়ন নেন। আসন হাতছাড়া হয় গফুর ভূঁইয়ার। এরপর উপজেলা বিএনপির সভাপতি, পরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হন এবং গফুর ভূঁইয়ার সাম্রাজ্য দখলে নেন।

এবারও সাম্রাজ্য মোবাশ্বের ভূইয়ার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ৩ নভেম্বর আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন দিলে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চূড়ান্ত মনোনয়নের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

এর আগে, ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাঙ্গড্ডা বাজার এলাকায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে হেসাখাল ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সেলিম ভূঁইয়াকে (৫৫) পিটিয়ে হত্যা করে মোবাশ্বেরের লোকজন।

দলীয় মনোনয়নে শেষ পর্যন্ত আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে চূড়ান্ত করেন। ৩ জানুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা বৈধতাও পায়। পরে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে হলফনামায় তার দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপনের অভিযোগে ইসিতে আপিল করেন একই আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজি নুরে আলম ছিদ্দিকি। ১৮ জানুয়ারি এ নিয়ে শুনানির পর গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন গফুর। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার করা রিটটি ২২ জানুয়ারি সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট গফুর ভূঁইয়ার করা রিট খারিজ করে দেওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিলে ইসির সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।

এদিকে, বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়ায় ৩ জানুয়ারি বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলম ভূইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এর বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আপিল করেন। শুনানি নিয়ে নির্বাচন কমিশন ১৮ জানুয়ারি মোবাশ্বেরের আপিল নামঞ্জুর করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ১৯ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টে রিট করেন।

গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের দিনই মোবাশ্বের আলমকে বিএনপি মহাসচিবের সই করা দলীয় প্রত্যয়নপত্রে কুমিল্লা-১০ আসনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। পরে ৬ জানুয়ারি আদালত তাকে প্রতীকসহ মনোনয়ন বৈধ করে দেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মাঠ থেকে আউট হন গফুর ভূঁইয়া, ইন হয় মোবাশ্বের আলম।

বিএনপির দ্বন্দ্বে প্রচারণায় জামায়াত এগিয়ে

বিএনপির এই দুই নেতার নিজেদের মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় আন্দোলন ও আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে সিংহভাগ সময় কেটেছে। এরমধ্যে গ্রামে গ্রামে ভোটারদের দ্বারে গেছেন জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত। নিজের কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন।

সম্প্রতি, মনোনয়ন নিয়ে মাঠে নামলেও ঘর (দল) গোছাতেই সময় পার করতে হচ্ছে বিএনপির প্রার্থী মোবাশ্বের ভূইয়াকে। এদিকে, জেলা বিএনপির মধ্যস্থতায় গফুর-মোবেশ্বর দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি নাঙ্গলকোটে মোবাশ্বের ভূইয়ার প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন গফুর ভূঁইয়া। এ সময় নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছেন বলে কর্মীদের জানান। তিনি বলেন, নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা নিশ্চিত করে লাভ নেই। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

যদিও ওপরে ওপরে নেতাদের এই মিল হয়েছে। ভেতরের অবস্থা জেনে কর্মীরা সিদ্ধান্ত নেবেন। কর্মী পর্যায়ে এর প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। যার কারণে এই নির্বাচনে এই দ্বন্দ্বের প্রভাব থাকবে বলে মনে করেন স্থানীয় একাধিক নেতাকর্মী।

এদিকে, বিএনপির ঘর গোছানোর মধেই প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রভিত্তিক শৃঙ্খলা বাহিনী গঠন থেকে শুরু করে সব আয়োজন প্রস্তুত করে ফেলেছেন বলে তার সমর্থকরা জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা চান তাদের সমস্যার সমাধান

প্রার্থীদের সমস্যার চেয়ে নাগরিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থনীয় সমস্যাগুলোর সমাধান। স্থানীয়দের দাবি, নাঙ্গলকোট ও নবগঠিত লালমাই উপজেলা এখনও নানা কারণে বঞ্চিত। নাঙ্গলকোটে ফায়ার সার্ভিস নাই। লাইনের গ্যাস নাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানে মানোন্নয়ন তেমন ঘটেনি। যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই খারাপ। সড়ক অবকাঠামো নেই তেমন। ট্রেন স্টেশনের সব ট্রেন থামে না। ঢাকা-চট্টগ্রামে ট্রেন যাতায়াতের জন্য লাকসামে যেতে হয়। কিশোর গ্যাং ও মাদকের অভয়ারণ্য হয়েছে।

পেরিয়া গ্রামের বাসিন্দা শফিউল্লাহ বলেন, আমাদের ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরে দখলের রাজত্ব চলছে। ডাকাতিয়া নদীর দক্ষিণ অংশে মৌকরা, রায়কোট, বাঙ্গড্ডা ও ঢালুয়া ইউনিয়ন লাগোয়া এলাকাগুলোতে দখল বেশি হয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে এগুলো চলে। ডাকাতিয়া নদী পুনঃখনন হয়নি দীর্ঘ সময় ধরে। নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে। ব্লক হয়ে গেছে বিভিন্ন স্পটে। দুই উপজেলার যোগাযোগ স্থাপনে কোনো ভালো ব্রিজ নেই, দায়সারাভাবে চলছে এখন।

এছাড়াও, অবৈধ অস্ত্র এবং অস্ত্রবাজ আছে। এ নিয়েও ভোটের মাঠে আছে শঙ্কা। অন্যদিকে, নবগঠিত লালমাই উপজেলার অনেক কিছুই গোছালো নয়। একেক অফিস একেক যায়গায়। এই সবই সাজাতে হবে নতুন সংসদ সদস্যকে।

পেরিয়া ইউনিয়নের বড় সাঙ্গিশ্বর গ্রামের সামছুল আলম বলেন, কত সরকার আইলো আর গেলো। নাঙ্গলকোটের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। কিছু কিছু ব্যক্তির উন্নয়ন হয়েছে। আমরা চাই এমন একজন এমপি নির্বাচিত হোক, যিনি নিজের উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে, নাঙ্গলকোটের সার্বিক উন্নয়ন করবে। গরীবের জন্য সরকার নির্ধারিত বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে পৌঁছে দেবে এবং মাদক ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করবে।

নতুন হয়েও ভোটের মাঠে এগিয়েছে জামায়াত

লালমাই ও নাঙ্গলকোট উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১০ আসন। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ২২ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৩ হাজার ৫৫৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩৫ জন। পোস্টাল ভোটার আছেন ১৩ হাজার ৯৩৮ জন।

কুমিল্লা-১০ (লালমাই-নাঙ্গলকোট) আসনে ভোটকেন্দ্র  ১৫২ টি। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত ১১৩টি। এই আসনে মোট প্রার্থী ৬ জন। এরা হলেন-বিএনপির মোবাশ্বের আলম ভূইয়া, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত, মুক্তিজোটের কাজী নূরে আলম সিদ্দিকী, আম জনতা পার্টির আব্দুল্লাহ আল নোমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সামছুদ্দোহা, গণঅধিকার পরিষদের রমিজ বিন আরিফ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হাসান আহমেদ।

স্থানীরা জানিয়েছেন, এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি-জামায়াতের। এরইমধ্যে বিএনপির দলীয় দুর্বলতার ফলে জামায়াত সাংগঠনিক ও জনসমর্থনে তাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। দ্বন্দ্বে ক্ষুব্ধ বিএনপির সমর্থক ও আওয়ামী লীগের ভোটাররাই হবে এই আসনের জয় পরাজয় নির্ধারণের মূল ফ্যাক্টর।

এসইউজে/এএমএ