সাহিত্য

বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গাজীর গান

গায়ে আলখাল্লা, পায়ে ঘুঙুর আর মাথায় পাগড়ি—দেখতে একেবারেই ব্যতিক্রমী এক শিল্পী। আসরের সময় চারপাশে ঘুরে ঘুরে তিনি গেয়ে চলেছেন গাজীর গান। তার কণ্ঠে ভেসে আসে গ্রামবাংলার একসময়ের জনপ্রিয়, অথচ আজ প্রায় বিস্মৃত এই লোকসংগীত। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই যা এখন একেবারেই অপরিচিত। তবুও সেই অচেনা সুরে থমকে দাঁড়াচ্ছেন পথচারীরা, বিস্ময়ে শুনছেন হাস্যরস ও লোককথায় ভরা গানের গল্প।

এই শিল্পীর নাম মো. রমহান গায়ান। প্রায় ৬০ বছর ধরে তিনি গাজীর গান গেয়ে আসছেন। আধুনিক গানের ভিড়ে চাপা পড়ে যাওয়া এই লোকসংগীতকে বাঁচিয়ে রাখাই যেন তার জীবনের ব্রত। যুগ বদলেছে, বদলেছে মানুষের রুচি কিন্তু গাজীর গানের প্রতি তার ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি।

৬ ফেব্রুয়ারি রাতে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বাঠইমুড়ি গ্রামে হয় গাজীর গানের একটি পালা। গ্রামবাংলার বিলুপ্তপ্রায় এই লোকসংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এ আয়োজন করেন স্থানীয় তোরাব আলী।

আরও পড়ুনচন্দ্রা ও কায়সারের ‌‘নৈঃশব্দ্য ও গোধূলির গান’ 

রমহান গায়ানের দলের দোতারা বাদক আজিজ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘একসময় আমাদের প্রায় প্রতি রাতেই বায়না থাকতো। এখন আর আগের মতো বায়না হয় না। তবুও এই সুরকে ধরে রাখতেই আমরা এখনো এই পেশায় রয়ে গেছি।’

স্থানীয় দর্শক মো. তানভীর আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এই প্রথম গাজীর গান শুনলাম। আগে শুধু বাবার মুখে এই গানের কথা শুনেছি। অনেক কৌতূহল নিয়ে গানটি শুনতে এসেছি। শিল্পী বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে গানের সুরে সুন্দরভাবে বিভিন্ন গল্প শোনান—দেখতে ও শুনতে ভালোই লাগে।’

আয়োজক মো. তোরাব আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, শীত এলেই আমাদের এলাকার অধিকাংশ বাড়ির উঠানে গাজীর গানের আয়োজন হতো। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। আমার মা বলেছিলেন, একবার হলেও আমাদের বাড়ির উঠানে এই গানের আয়োজন করতে।’

আরও পড়ুনশার্ল বোদলেয়ার: এক প্রতীকবাদী মহাকবি 

গাজীর গানের শিল্পী মো. রমহান গায়ান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই এই গানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। কখন যে গাজীর গানের প্রেমে পড়ে গেছি, তা নিজেও বলতে পারি না। প্রায় ৬০ বছর ধরে মানুষকে গাজীর গান শুনিয়ে যাচ্ছি।’

গাজীর গান বা গাজী পীরের বন্দনা বাংলাদেশের ফরিদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে একসময়ের প্রচলিত একধরনের মাহাত্ম্য গীতি। গাজী পীর সাহেব মুসলমান হলেও অন্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের একটি অংশ তার ভক্ত ছিল। ভক্তরাই এ গানের আসর বসাতো। গান চলার সময় আসরে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা তাদের মানতের অর্থ গাজীর উদ্দেশ্যে দান করতো।

সন্তান লাভ, রোগব্যাধির উপশম, অধিক ফসল উৎপাদন, গো-জাতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি এরূপ মনস্কামনা পূরণার্থে গাজীর গানের পালা দেওয়া হতো। এ নিয়ে আসর বসিয়ে কিছু লৌকিক কার্যক্রমসহ গাজীর গান পরিবেশিত হতো।

এসইউ