বহু শতাব্দী ধরে লাল গোলাপ প্রেম, আবেগ ও রোম্যান্সের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিশোর বয়সের সরল আকর্ষণ থেকে শুরু করে পরিণত বয়সের গভীর ভালোবাসার অনুভূতির সঙ্গেই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই ফুল। প্রিয় মানুষকে মনের কথা জানানোর এক অনন্য ভাষা হয়ে উঠেছে লাল গোলাপ।
সাহিত্যিকদের ভাষায়, গোলাপ যেমন সুন্দর, তেমনি তার ডালপালায় থাকা কাঁটা যেন ইঙ্গিত দেয়, ভালোবাসা কখনোই সহজ নয়। তা অর্জন করতে হলে লাগে সাহস, ধৈর্য ও ত্যাগ।
প্রেমের মাস আর রোজ ডের সূচনাফেব্রুয়ারি মানেই ভালোবাসার মাস। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’ দিয়ে শুরু হয় প্রেমের সপ্তাহ। একটি লাল গোলাপ হাতে তুলে দিয়েই অনেকে প্রকাশ করেন মনের গোপন কথা। তাই এ সময় বিশ্বজুড়ে গোলাপের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
লাল গোলাপ আর ভালোবাসার সম্পর্ক আজকের নয়। প্রাচীন রোমান যুগেও প্রেম নিবেদনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল এই ফুল। সময়ের প্রবাহে গোলাপ শুধু একটি ফুল হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে আবেগ, রোম্যান্স ও আকাঙ্ক্ষার চিরন্তন প্রতীক।
ভ্যালেন্টাইনস ডে ঘিরে যে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের গল্প প্রচলিত, তার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে লাল গোলাপের প্রতীকী উপস্থিতি। আসলে সবটাই মানুষের তৈরি এক বিশেষ ‘আইকনোগ্রাফি’ যেখানে একটি ফুল হয়ে ওঠে ভালোবাসার ভাষা, অনুভূতির চিহ্ন, আর হৃদয়ের বার্তাবাহক।
পৌরাণিক কাহিনির রক্তিম ছোঁয়াইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, প্রাচীন গ্রীকদের প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি (রোমানদের কাছে ভেনাস) তার প্রেমিক অ্যাডোনিসকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। কাহিনী অনুযায়ী, অ্যাডোনিসের প্রতি প্রেমিকের বিরহে তার বেদনার রক্তক্ষরণ ঘটে, এবং সেই রক্তে সাদা গোলাপ রঙ পরিবর্তন করে লাল হয়ে যায়। এই পৌরাণিক কাহিনি ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সপ্তদশ শতকে সুইডেনের রাজা দ্বিতীয় চার্লস এই গল্পকে আরও প্রসারিত করেন। তিনি পার্সিয়া ভ্রমণের সময় ‘ফুলের ভাষা’ বা সাংকেতিক ভাষা প্রচলনের ঘোষণা দেন। এই ভাষার মূল উদ্দেশ্য ছিল কথা না বলেই অনেক কিছু প্রকাশ করা। সেই ধারায় লাল গোলাপের অর্থ হয়ে দাঁড়ায় গভীর প্রেম।
রাজকীয় ভালোবাসায় গোলাপমুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর নাকি প্রতিদিন নূরজাহানের জন্য একটি করে তাজা লাল গোলাপ পাঠাতেন। রানী ভিক্টোরিয়াও তার স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্টকে গোলাপ উপহার দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন। ইতিহাস, সাহিত্য আর রাজকীয় রোম্যান্স সবখানেই গোলাপের উপস্থিতি দেখা যায়।
মূলত রাজা এবং পৌরাণিক এই দুই কাহিনি মিলিয়ে সেই সতের শতক থেকে লাল গোলাপ হয়ে উঠেছে বিশ্বে ভালোবাসার প্রতীক। ফলে এখন ভালোবাসা দিবস কিংবা প্রেম নিবেদনে প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে দেখা মেলে লাল গোলাপের।
কেন লাল গোলাপই ভালোবাসার প্রতীক?লাল গোলাপকে ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের চিরন্তন প্রতীক বলা হয়। এর উজ্জ্বল লাল রং শক্তি, আকর্ষণ এবং গভীর আবেগের প্রতিচ্ছবি। কাউকে লাল গোলাপ উপহার দেওয়ার অর্থ শুধু একটি ফুল দেওয়া নয়,এটি মনের গভীর অনুভূতি পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য উপায়। অনেক সময় যে কথাগুলো মুখে বলা যায় না, একটি লাল গোলাপ সেগুলো সহজেই বলে দেয়।
অভিমান ভাঙাতে, ভালোবাসার কথা জানাতে কিংবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে লাল গোলাপের জুড়ি নেই। যুগের পর যুগ ধরে এই ফুল প্রেমের প্রতীক হয়ে আছে। সাহিত্য থেকে বাস্তব জীবন, সব জায়গাতেই গোলাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুগ্ধতা আর আবেগের গল্প।
হৃদয়ের গভীর অনুভূতি প্রকাশে লাল গোলাপের মতো শক্তিশালী প্রতীক খুব কমই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে গোলাপের সম্পর্ক দিন দিন আরও গভীর হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ হলো গোলাপ সুন্দর, এর ঘ্রাণ মোহনীয় এবং এই ফুলের সরবরাহব্যবস্থাও বেশ সহজ।
প্রেমের ইতিহাস যত পুরোনো, গোলাপের গল্পও ততটাই গভীর। প্রিয়জনকে নিজের অনুভূতি জানাতে চাইলে একগুচ্ছ লাল গোলাপই যথেষ্ট। আজও প্রেম নিবেদনের মুহূর্তে দেখা মেলে সেই চিরচেনা ফুলের ব্যবহার।
সূত্র:দ্য মিলিয়ন রোজেস, মিডিয়াম, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন:সঙ্গীর জন্মদিন ভুলে গেছেন? শেষ মুহূর্তে মন জয় করার উপায় যে কারণে মানুষ সম্পর্কে জড়ায়
এসএকেওয়াই/