উম্মে হাবিবা কনা
ম্রো জনগোষ্ঠীদের নিয়ে তথ্যনির্ভর একটি উপন্যাস ‘লিটল মাস্টার’ লিখেছেন কথাশিল্পী অঞ্জন হাসান পবন। এটি মূলত বিরহ-প্রেমের আখ্যান। যেখানে উঠে এসেছে ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, ধর্মীয় আচার, লোকশিল্প, লোকগল্পসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
দুই যমজ ভাই পাহাড় এবং ধূসরের মিরিঞ্জা ভ্রমণের অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রবাহের মধ্যে এগিয়ে যায় গল্প। সেখানে রুইপাও নামক এক সুন্দরী ম্রো যুবতির প্রেমে পড়ে ধূসর। যা মেনে নিতে পারে না পাহাড়ের এক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের স্থানীয় নেতা মেইনক্লাম ম্রো। সেই সূত্র ধরে পাহাড়ে চলতে থাকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। রুইপাওকে কাছে পেতে তার সম্প্রদায় সম্পর্কে জানতে গিয়ে ধূসর উদঘাটন করে ম্রো জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন অমীমাংসিত রহস্য।
যমজ দুইভাই পাহাড় এবং ধূসর। তাদের দুরন্তপনা-খুনসুটিময় ভালোবাসা-প্রকৃতিপ্রেম পাঠককে তৃপ্ত করবে। তারা ব্ল্যাক লাভার, সেম পোশাক পরে। একসাথে ঘুরে বেড়ায়, শখ পূরণ করে। মা বন্ধুর মতো, তাদের সেভাবেই বড় করেছেন; যাতে অসৎ সঙ্গে না পড়ে যায়। যে কারণে বড় হয়ে আর ততটা বাধ্যবাধকতা রাখেনি।
মা শামীমা জামান একজন চমৎকার মানুষ। তিনি বইপ্রেমী, সেইসঙ্গে পাখিপ্রেমী। রান্নাঘরের জানালা দিয়েও তিনি ঘুঘু পাখিকে হাতে মুগডাল খেতে দেন। এ ছাড়া বাড়িতে ছাদে বা আশেপাশে সর্বত্র পাখির জন্য খাবারসহ পানির পাত্র থাকে। বাসায় অসংখ্য গাছ, শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে যে এত সুন্দর কোলাহলমুক্ত পরিবেশ হতে পারে একটা বাসার। আমি পড়েছি আর চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি যেন।
আরও পড়ুনঅলকানন্দা শহরে: কবিতার সরোবরে অমৃত মন্থনধূসরের পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে হয় এবং সে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চায়। সে কথা মাকে জানায় এবং বড় ভাই পাহাড়কে নিয়ে পাহাড়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়। যদিও কতদিন থাকবে তেমন প্ল্যান নেই। তবে এই যে ঘুরতে যায় আর প্রকৃতির সংস্পর্শে বাঁচতে চায়; এমন স্বপ্ন অনেকের কাছে অধরাই থেকে যায়। সেদিক দিয়ে তারা দুই ভাই কিন্তু ভাগ্যবান। কিন্তু পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার পরপরই তাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসতে থাকে। তারা যেমন বেশ ভালো সময় কাটাতে থাকে; তেমনই বিপদগ্রস্তও হয়ে পরে।
ধূসর ও পাহাড় মিরিঞ্জা বাজারে নেমে তাদের ট্যুরের সূচনা করে। এরপর পুইত্তাপাড়া, লাংগী পাড়া, লাইনঝিড়ি, লামা, থানচি, সুখ পাহাড়-দুখ পাহাড়সহ নানাবিধ জায়গায় ঘোরে। রাতে ক্যাম্পিং করে পাহাড়ে। নতুন সব খাবার টেস্ট করে, ভিডিও করে। ম্রো সম্প্রদায়ের সাথে মিশে তাদের সাথে চলাফেরা করে একদম তাদের পরিবার হয়ে যায়। একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া, চা খাওয়া, মুন্ডি খাওয়াসহ তাদের খাবার ট্রাই করে। তাদের ইতিহাস নিয়ে স্ট্যাডি করে। তাদের অনুষ্ঠানাদি-রিচুয়াল-কালচার একদম কাছ থেকে উপভোগ করে।
পরবর্তীতে দুখ পাহাড়ে ধূসর জুম ঘর বানিয়ে অনেকদিন রাতযাপনও করে। সে জুম চাষ করে, পশু শিকারে যাওয়াসহ সব ধরনের স্বাদ সে গ্রহণ করে। এ ছাড়া যেহেতু পাহাড়ে আদিবাসীদের মাঝে নেশাদ্রব্য পান করার বিষয় আছে, সেখানে গিয়ে পাহাড় এবং ধূসর সেসব পান করে সবার সাথে।
উপন্যাসের চরিত্র শামীমা জামান একজন বিধবা সম্ভ্রান্ত রুচিশীল নারী। যিনি স্বামীকে হারিয়ে দুই ছেলেকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন। পাহাড় তার বড় ছেলে। দেহে প্রাণ থাকা অবস্থায় রোদমীলাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো সে। পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ইউনিক পোস্টার ডিজাইন করে মানুষের মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখতে চাইতো। অন্য ছেলে ধূসর পাহাড়ে একটি রিসোর্ট করার স্বপ্ন দেখে এবং ব্লগ, ট্রাভেল ভিডিও করে। যা তাদের জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।
আরও পড়ুনঘরে বাইরে: প্রথা ভাঙার উপাখ্যানপাহাড়ে গিয়ে দুই ভাইয়ের সঙ্গে রুইপাওয়ের প্রথম দেখা ও পরিচয় হয়। প্রথম দেখায় রুইপাওয়ের গজদাঁতের প্রেমে পড়ে যায় ধূসর। তার মাধ্যমে পাহাড়ে ঘোরাফেরা করার জন্য পথপ্রদর্শক মেন্টামের সঙ্গে পরিচয় হয় দুই ভাইয়ের। এরপরে কী হয় জানতে হলে বইটি পড়তে হবে।
বইটির নামকরণে লেখকের দূরদর্শিতা অসাধারণ। লেখক চরিত্রগুলোকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আর নামকরণ দুইয়ে মিলে পারফেক্ট কম্বিনেশন। আর প্রচ্ছদ পাহাড় ও ম্রো আদিবাসীদের কথা মাথায় রেখে দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর মানসম্মত একটি বই। কেউ গবেষণা করতে চাইলে সাহায্যকারী হবে। চাইলে দুটো পার্ট করে সিনেমা বানানো যাবে। ধারাবাহিকভাবে নাটকও করা যাবে। পাঠক বা দর্শক তন্ময় হয়ে উপভোগ করবে।
দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বইটি শেষ করলাম। যতটা এক্সাইটমেন্ট ছিল বইটা শুরু করে এবং বইটা পড়ে, শেষটায় এত খারাপ লাগলো। তবে প্রকৃতি নিয়ে লেখা বই, প্রিয় বইয়ের তালিকার শীর্ষে স্থান করে নিলো ‘লিটল মাস্টার’।
বই: লিটল মাস্টার লেখক: অঞ্জন হাসান পবন প্রকাশনী: কিংবদন্তী পাবলিকেশন প্রচ্ছদ: আইয়ুব আল আমিনমূল্য: ৪০০ টাকা।
এসইউ