লাইফস্টাইল

বাবার সঙ্গে শিশুর অ্যাটাচমেন্ট কি আসলেই দরকার

শিশু জন্মের পর মা-শিশুর সম্পর্কের গভীরতার কথা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে - বাবার ভূমিকা শিশু জীবনের মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশে শুধু সহায়কই নয়, বরং অপূরণীয়।

বাবা-সন্তান সম্পর্ক বা অ্যাটাচমেন্ট শুধু আবেগ নয়, শিশুদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা ও মানসিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে।

১. বাবা-সন্তান সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

মনোবিজ্ঞান ও শিশুর বিকাশ গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা শিশুর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ ও খেলাধুলার মাধ্যমে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যা শিশুর মস্তিষ্কে নিরাপত্তার অনুভূতি ও স্বাস্থ্যকর আবেগ নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে।

যেমন - বাবার সঙ্গে দৌড়ানো বা নতুন কৌশল শেখা - এই কাজগুলো শুধু আনন্দ দেয় না, বরং শিশুদের সমস্যা সমাধান, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক দক্ষতা উন্নত করে।

এ সম্পর্কটি শুধু সময় কাটানোর বিষয় নয়। গবেষণায় দেখা গেছে - যে বাবারা শিশুর সিগন্যাল বোঝেন, ধীরে-ধীরে প্রতিক্রিয়া দেন এবং খেলায় সঙ্গী হন - তাদের সন্তানদের নিরাপদ অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। এই নিরাপত্তার অনুভূতি শিশুকে আরও আত্মবিশ্বাসী বানায় এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করে।

২. শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে বাবার ভূমিকা

যে শিশুদের সঙ্গে তার বাবার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারা উচ্চ মাত্রার উদ্বেগ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা আচরণগত সমস্যায় তুলনামূলকভাবে কম জড়ায়। বাবার আবেগপূর্ণ স্পর্শ - যেমন আদর করা, কাঁধে হাত রাখা, জড়িয়ে ধরা বা মনোযোগ দিয়ে পাশে বসা - শুধু মুহূর্তের সান্ত্বনা দেয় না, এটি শিশুর মনের ভেতরের ভিত্তিও গড়ে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের স্পর্শ শিশুকে নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য বোধ করায়। শিশুর মনে তখন একটি বার্তা যায় - আমি গুরুত্বপূর্ণ, আমাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অনুভূতি থেকেই ধীরে ধীরে আত্মসম্মান তৈরি হয়।

একই সঙ্গে, বাবা যখন সন্তানের আবেগ বুঝে সাড়া দেন, তখন শিশু অন্যের অনুভূতিও বোঝা শেখে। এতে সহানুভূতি বা অন্যের কষ্ট-আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

পরবর্তীতে এই অভিজ্ঞতাগুলোই শিশুকে বন্ধু, সহপাঠী বা ভবিষ্যতের সম্পর্কগুলোতে বিশ্বাস, সম্মান ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা দেয়। অর্থাৎ, বাবার আবেগ-সংক্রান্ত আচরণ শিশুর ভবিষ্যৎ সামাজিক সম্পর্ককে সুস্থ ও সফল করতে ভিত তৈরি করে।

৩. শিশুর ভাষা ও মস্তিষ্ক বিকাশে বাবার ভূমিকা

বাবা যখন সন্তানের সঙ্গে গল্প বলেন, ছড়া বা গান শোনান, বই পড়ে শোনান কিংবা সাধারণ কথাবার্তা বলেন - তখন শিশুর মস্তিষ্ক একসঙ্গে অনেক কিছু শেখে। শব্দ চিনতে শেখে, নতুন শব্দ জমা হয় এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার সঙ্গে এই ধরনের কথোপকথন শিশুর ভাষা শেখার গতি ও ভাবনা বোঝার ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।এ ছাড়া বাবা ও সন্তানের আলাদা ধরনের খেলাধুলা বা আচরণ - যেমন নতুন কিছু শেখানো, প্রশ্ন করা, সমস্যা সমাধানের খেলা - শিশুর মস্তিষ্কের চিন্তা ও শেখার অংশকে আরও সক্রিয় করে।

৪. কবে এবং কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তুলবেন?

শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বাবারা যদি নিয়মিত খেলাধুলা ও সময় দেওয়ার মাধ্যমে সন্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে শিশুর মনে বাবার প্রতি সহজেই বিশ্বাস ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

নিয়মিত কথা বলা, একসঙ্গে বই দেখা, ছবি আঁকা, হাঁটতে যাওয়া বা ছোট ছোট অভিজ্ঞতামূলক কাজে অংশ নেওয়া - এসবের মাধ্যমে বাবার সঙ্গে শিশুর মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগ আরও শক্ত হয়।

শিশুর বেড়ে ওঠায় শুধু মায়ের যত্নই নয়, বাবার উপস্থিতি ও সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাবার সঙ্গে সময় কাটানো শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আবেগ বুঝতে শেখায় এবং অন্যদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা তৈরি করে।

বাবা-মা দু’জন মিলেই যখন সচেতনভাবে সন্তানের পাশে থাকেন, তখন শিশুর মন ও মস্তিষ্ক - দুটোই সুস্থভাবে বিকশিত হয়।

সূত্র: চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ জার্নাল (২০২৪), বায়োমেড সেন্ট্রাল (বিএমসি) টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউরোপীয় ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি গবেষণা নেটওয়ার্ক

এএমপি/এএসএম