ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের বাকি মাত্র কয়েকদিন। এরই মধ্যে প্রচার-প্রচারণাসহ নানা প্রতিশ্রুতিতে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজবাড়ী-১ সংসদীয় এলাকার নির্বাচনি পরিবেশ।
আসনটিতে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের লড়াই হবে মূলত বিএনপির প্রার্থী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলামের মধ্যে।
ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণার গতি। তবে এখন পর্যন্ত আসনটির কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পদ্মা সেতু (দ্বিতীয়), পদ্মা ব্যারেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক হাসপাতাল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে গণসংযোগ, পথসভা ও উঠান বৈঠক। তবে এবার ভিন্নতা এসেছে ফেস্টুন ও ব্যানার সাঁটানোতে। নির্বাচনি এলাকার সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁশ ও রশির সাহায্যে টানানো হয়েছে সাদা-কালো ফেস্টুন ও ব্যানার। চায়ের দোকান, হাট-বাজার, অফিস-আদালতসহ সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, কে হচ্ছেন এই আসনের আগামীর অভিভাবক।
অন্যদিকে নির্বাচনি মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় সাধারণ ভোটারদের মাঝে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। তবে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কাজ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পদ্মা নদীবিধৌত এ আসনটি রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা। ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৩০ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান।
এখানে বিএনপির প্রার্থী জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির জেলা আমির অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম। এছাড়া জাতীয় পার্টির খোন্দকার হাবিবুর রহমান বাচ্চু ও জাকের পার্টির মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আসনটিতে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু একবার ২০০১ সালে জয়ী হয়েছিল বিএনপি। এছাড়া দীর্ঘ সময় এই আসনে আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের।
আসনটিতে বিগত সময়ের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরা ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, পাংশার হাবাসপুরে পদ্মা ব্যারেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক হাসপাতাল ও শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন বিএনপির প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা।
এদিকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত ন্যায় এবং ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। অপরদিকে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও ভোটের মাঠের প্রচার-প্রচারণায় তেমন একটা দেখা মিলছে না জাতীয় পার্টি ও জাকের পার্টির প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের।
ভোটারদের ভাষ্য, রাজবাড়ীর প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। সেই সঙ্গে নেই চিকিৎসার জন্য ভালো হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ। কল-কারখানা না থাকায় নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। নির্বাচন এলে প্রার্থীরা এগুলো করার কথা বলেন, কিন্তু নির্বাচনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় না, শুধু নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়। তাই এবার যিনি নদীভাঙন রোধ, শিক্ষা-চিকিৎসার উন্নয়ন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি রোধ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন, তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হবে।
নতুন ভোটাররা জানান, তারা ভোট দেবেন বলে আনন্দিত। তারা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে চান। তবে যারাই ক্ষমতায় আসুক না, যেন তরুণদের সুখ-দুঃখে পাশে থেকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন সেই প্রত্যাশা তাদের।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী খোন্দকার হাবিবুর রহমান বাচ্চু বলেন, বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টিকে বাদ রেখে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। সে হিসেবে আমাদের আওয়ামী লীগের তকমা দিয়ে কিছু কিছু স্থানে প্রচারণায় বাধার সৃষ্টি করছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালো আছে। এবার মূলত আমাদের দল ও মার্কা রক্ষার নির্বাচন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের অনিয়ম, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জনগণের অধিকার আদায়ে ব্যর্থতার কারণে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ এখন দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন ইনসাফের রাষ্ট্র চায়। সেই ধারাবাহিকতায় রাজবাড়ী-১ আসনে জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে আমাদের সমর্থন দিচ্ছে। আমরা সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কামনা করছি।
বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, নতুন সময় এসেছে। আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজবাড়ীসহ সারাদেশে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারিনি। এখন ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ এসেছে। আমরা বিজয়ী হলে নদী বাঁচানো, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনসহ শিক্ষা-চিকিৎসার উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।
রুবেলুর রহমান/এমএন/এএসএম