মতামত

সেনাবাহিনীকে অসম্মান করার এই প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যদিও ঘটনাটি বাস্তবে প্রায় এক মাস আগের। ভিডিওটিতে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ড. খালিদুজ্জামান ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিউটিরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। সময়ের ব্যবধান থাকলেও ভিডিওটি নতুন করে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি আবারও জনআলোচনার কেন্দ্রে এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট একদম পরিষ্কার। ড. খালিদুজ্জামান সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে মিরপুরে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা গানম্যানসহ প্রবেশের দাবি জানান। কিন্তু সেনানিবাসের অভ্যন্তরে কোনো বেসামরিক ব্যক্তি অস্ত্রসহ প্রবেশ করতে পারবেন না-এটি দেশের প্রচলিত সামরিক আইন ও নিরাপত্তা নীতির অংশ। এই আইন কোনো ব্যক্তির পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য পদমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না। ডিউটিরত সেনা সদস্যরা বারবার শান্ত ও বিনয়ের সঙ্গে এই আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং স্পষ্ট করে জানান- তিনি যেতে পারবেন, তবে অস্ত্র নিয়ে নয়।

আইনের এই অবস্থান মেনে নিলে ঘটনাটির সেখানেই সমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ভিডিওতে দেখা যায়, ড. খালিদুজ্জামান আইন মেনে নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন এবং ক্রমে তার আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তিনি সেনা সদস্যদের উদ্দেশে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং কোনো দায়িত্বশীল নাগরিকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, তার বক্তব্যের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইঙ্গিত। তিনি সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, তারা নাকি দেশটাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, দেশকে গোলামে পরিণত করছে। এ ধরনের বক্তব্য শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এবং অবমাননার শামিল। সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। তারা রাষ্ট্রের, সংবিধানের এবং দেশের সার্বভৌমত্বের রক্ষক।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুরো ঘটনাজুড়ে ডিউটিরত সেনা সদস্যদের আচরণ ছিল প্রশংসনীয়। তারা কোনো উসকানিতে সাড়া দেননি, কণ্ঠ চড়াননি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণে যাননি। বরং তারা বারবার আইনের কথাই বলেছেন এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছেন। এমনকি ড. খালিদুজ্জামান ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পরও যখন একই আইনি অবস্থান জানানো হয়, তখনও মাঠপর্যায়ের সেনা সদস্যরা বিনয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এই আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়, তাদের শৃঙ্খলা, সংযম ও আইনের প্রতি আনুগত্যেই তাদের প্রকৃত পরিচয়। রাষ্ট্রের এমন একটি সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব পালনকালে তারা যে ধৈর্য দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যিনি নির্বাচিত হলে দেশের একজন আইনপ্রণেতা হবেন, তিনি যদি আইন প্রয়োগের জায়গায় এসে আইন মানতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে আইনের শাসনের ধারণা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সংসদ সদস্য হওয়া মানে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আইন মেনে চলার নৈতিক দায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা।

তবে আলোচনার স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্বীকার করতেই হয়। ঘটনার পর ড. খালিদুজ্জামান নিজের ভুল স্বীকার করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভুল স্বীকার করা মানে অন্তত দায় এড়ানোর চেষ্টা না করা। এই জায়গায় তার বক্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য- ভুল স্বীকার করলেই ঘটনার গুরুত্ব কমে যায় না। কারণ এখানে প্রশ্নটি কোনো একক ব্যক্তির আচরণে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রশ্নটি বৃহত্তর একটি প্রবণতা নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে বক্তব্য দেওয়া, তাদের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা সরাসরি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজনীতিকদের বক্তব্য সমাজে বহুগুণে প্রতিফলিত হয়। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন সেনাবাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক ও অবমাননাকর কথা বলেন, তখন তা শুধু বাহিনীর মনোবল নয়, সাধারণ মানুষের আস্থাকেও আঘাত করে। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বহুবার প্রমাণ করেছে- তারা সংকটে দেশের পাশে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশন-সবখানেই তাদের ভূমিকা প্রশংসিত ও স্বীকৃত। এই বাহিনীকে নিয়ে দায়িত্বহীন মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই ঘটনার শিক্ষা পরিষ্কার। আইন সবার জন্য সমান। সেনানিবাসে আইন প্রয়োগ কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় বিধান। সেই বিধান মানা মানেই রাষ্ট্রকে সম্মান করা। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে শালীন, দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক।

শেষ পর্যন্ত বলতে হয়- এই ঘটনায় সেনাবাহিনী আবারও প্রমাণ করেছে, তারা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়- তারা বাংলাদেশের। আর রাজনীতিকদের জন্য বার্তাও স্পষ্ট-ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা নয়, সংযম, দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সম্মানই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। মনে রাখতে হবে- সেনাবাহিনীকে অসম্মান করার কোনো প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়- না এখন, না ভবিষ্যতে।

লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/এমএস