আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশি তরুণরা কি আসলেই ভারতবিরোধী হয়ে উঠছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দেয়ালগুলো আবারও সরব হয়ে উঠেছে। রাস্তাঘাটজুড়ে গায়ে পড়ে থাকা দেয়ালচিত্র, কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো ব্যঙ্গাত্মক, কখনো কবিতার মতো। এগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানকে, যেটি টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ঘটায়। ওই বছরের ৫ আগস্ট পদত্যাগের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান ও এখন পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করছেন।

ঢাবির ক্যাম্পাসে ছাত্ররা জটলা বেঁধে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছে। অপরিচ্ছন্ন লনের পাশে লাল লন্ঠন দুলছে, সরল এক চীনা নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে। এমন এক দেশে, যেখানে চীন ও ভারত দুপক্ষই প্রভাব বিস্তারে মরিয়া। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এখানকার বহু তরুণের জন্য প্রথমবারের মতো প্রকৃত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ।

শেখ হাসিনার পতনের পরপরই শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। গত বছরের ১৭ নভেম্বর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এখন হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। ঢাকার তরফ থেকে একাধিকবার প্রত্যর্পনের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন দেশের লিবারেল-সেন্ট্রিস্ট রাজনীতিতে সেই খালি জায়গা দখলের দিকে এগোচ্ছে। আর ‘প্রধান ইসলামপন্থি’ দল জামায়াতে ইসলামী ছাত্র-অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া একটি দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছে।

তবে ঢাবির দেয়ালগুলোতে ফুটে ওঠা স্লোগানগুলো শুধু ঘরোয়া রাজনীতি কেন্দ্র করে নয়, সেগুলো নিশানা করছে সীমান্তের ওপারেও।

‘ঢাকা, নট দিল্লি’ এই স্লোগান এখন শুধু দেয়ালে নয়, সাড়ির গায়ে সেলাই করা হচ্ছে। তরুণদের মুখে ‘হেজিমনি’ শব্দটি এখন দৈনন্দিন ভাষা, যা ভারতের প্রভাব ও আধিপত্যের সংক্ষিপ্ত রূপ।

২৪ বছর বয়সি সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন বলেন, যুবসমাজ মনে করে, ভারত বহু বছর ধরে আমাদের দেশে হস্তক্ষেপ করছে। বিশেষ করে, ২০১৪ সালের ‘একদলীয়’ নির্বাচনের পর সেই আধিপত্য আরও বেড়েছিল।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ক্ষয়ে যাওয়ার পেছনে দিল্লির ভূমিকা তরুণদের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, যাকে কখনো কখনো প্রতিবেশী কূটনীতির আদর্শ বলা হতো, তা এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক অরবিন্দ পালিওয়াল বলেন, বাংলাদেশে তীব্র ভারতবিরোধী জনমত এবং ভারতের ভেতর থেকেই প্রতিবেশীকে নিয়ে কঠোর ও অনেক সময় বৈরী রাজনৈতিক বক্তব্য- এই দুই কারণে দিল্লির অবস্থান দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশি তরুণদের অনেকেই মনে করেন, হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদকে ভারত নিঃশর্ত সমর্থন করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪- এই তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের ‘সমর্থন’ তারা ভোলেনি।

ঢাবি শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন বলেন, ভারত কোনো চাপ ছাড়াই, কোনো প্রশ্ন ছাড়াই হাসিনা সরকারকে সমর্থন করেছে। মানুষ মনে করে গণতন্ত্র ধ্বংসে ভারত সমর্থন দিয়েছে।

এই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের সমস্যা- সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য বাধা এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের উত্তেজনাকর বক্তব্য। অনেকের বিশ্বাস জন্মেছে যে ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং অনুগত হিসেবে দেখে।

বাংলাদেশের স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একটি ভারতীয় কোম্পানি নাকি বাংলাদেশকে প্রতারণা করছে; যদিও কোম্পানিটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফেসবুকে একটি প্রধান দৈনিককে ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রচারণা চলছে। দুই দেশই বেশিরভাগ ভিসা পরিষেবা স্থগিত রেখেছে।

একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএলে অংশ নিতে না দেওয়া ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান- এই বিষয়গুলোও ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

পালিওয়াল বলেন, ভারতের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কিন্তু বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ফল অর্জন কঠিন। তবে পালিওয়াল সংক্ষেপে বলেন, ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি- এসবই নিশ্চিত করে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরকে উপেক্ষা করে থাকতে পারবে না।

কৌশল পাল্টানোর চেষ্টা করছে ভারত

গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিত হন ও বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফিরে শীর্ষ প্রার্থীদের একজন তিনি। অনেকেই মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তারেকেই এগিয়ে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে দিল্লি। জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা বলেন, গত এক বছরে ভারতীয় কর্মকর্তারা চারবার দলটির সঙ্গে বৈঠক করেছে ও সম্প্রতি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও জানিয়েছে। তবুও এসব কৌশলগত পরিবর্তন বৃহত্তর সংকট থামাতে পারেনি।

বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডেইল স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, এখনকার নিম্নতা পূর্ববর্তী সব সংকটকেও ছাড়িয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার আমলে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল ভিন্ন চেহারার। ১৭ বছরে বাংলাদেশ ভারতকে নিরাপত্তা, ট্রানজিট, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময়- সবক্ষেত্রেই সুযোগ দেয়। আর এখন মানুষের যোগাযোগও সেরকম চলছে না, সৌহার্দ্যও নয়।

আবার অনেক বাংলাদেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন হাসিনার পতনের পর ভারতের আচরণে। তারা আশা করেছিল, দিল্লি তার নীতি পুনর্বিবেচনা করবে। কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল- হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া, ভিসা ও বাণিজ্য সীমিত করা, যা বাংলাদেশের কাছে বার্তা দিয়েছে যে প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশিরা মূল্যবান নয়।

উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে

ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন বাংলাদেশিদের ‘উইপোকা’ বলেন বা ‘গাজায় ইসরায়েল যেমন শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশকেও তেমন শিক্ষা দেওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে- প্রশ্ন করেন কামাল আহমেদ।

এরপর আসে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক, আইপিএল সম্প্রচার স্থগিত, যা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবু ঢাকার কর্মকর্তারা মনে করেন, সম্পর্ককে একপাক্ষিক সংকট হিসেবে দেখা ভুল। ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘বহুমাত্রিক’। ভূগোল, ইতিহাস, ভাষা- সবই আমাদের যুক্ত করে। আমরা ৫৪টি নদী ভাগাভাগি করি। বলতে গেলে, একই ইতিহাস, একই ভাষা। তবুও তিনি স্বীকার করেন, জনমনে ক্ষোভ তীব্র।

মানুষকে জিজ্ঞেস করলে কেন ১৫ বছর ভোট দিতে পারেনি, অনেকেই এক উত্তর দেয়- হাসিনার স্বৈরশাসন ও ভারতের সমর্থনের কারণে।

২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষোভ আরও গভীর করেছে। শফিকুল আলম বলেন, শত শত তরুণ নিহত হলো, আর তিনি ভারতে পালালেন।

প্রেস সচিব ভারতীয় গণমাধ্যমের ‘অতিরঞ্জিত’ সংখ্যালঘু নির্যাতনের বয়ানেরও সমালোচনা করেন। শফিকুল বলেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা রাজনীতিকভাবে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

এদিকে, ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এই সংকট শুধু ভুল বোঝাবুঝি নয়, আরও গভীর। এটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তার মতে, বহুদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সীমাবদ্ধ ছিল ‘দল বা ব্যক্তির সঙ্গে’, রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়।

পানিবণ্টন ইস্যু অসমতার প্রতীক হয়েছে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ডও বাংলাদেশিদের মনে আঘাত করেছে। ভারত নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই সংকট এখন অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বাড়তে পারতো, যদি রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হতো।

তবুও মানুষের মনে ভারতবিদ্বেষ পুরোপুরি একরকম নয়। ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ভারত শুনলে মনে হয় শত্রু। তবে তিনি স্বীকার করেন, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। কারণ সীমান্তপাড়ের পরিবার-পরিজন, ইতিহাস, সবই মানুষে মানুষে সম্পর্ক জুড়ে দেয়।

এদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা বড় ইস্যু হলেও, সব দল জানে যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ছাড়া উপায় নেই। তাই সম্পর্ক মেরামত সহজ নয়, বা কেবল সরকার বদলালে সমাধান মিলবে না।

তবুও আশা পুরোপুরি শেষ নয়। আলী রীয়াজের ভাষায়, রাষ্ট্রের সম্পর্ক কখনো অপরিবর্তনীয় নয়। শর্ত হলো- দিল্লিকে তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

অবশেষে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুর মাহবুব জুবায়ের বলেন, দুই দেশের নেতৃত্ব যদি আন্তরিকতা, বর্তমান বাস্তবতা ও পারস্পরিক মর্যাদা মেনে এগোয়, তাহলে গঠনমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ