নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি বর্তমানে খারাপ অবস্থায় নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আগামী নির্বাচিত সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস: অ্যান ইকোনমিক রিফর্ম এজেন্ডা ফর দ্য ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অর্থনীতি একসময় ভেঙে পড়ার মুখে ছিল। আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি, তবে চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তব এবং এগুলো মোকাবিলায় সতর্ক ও ধারাবাহিক নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা চাপের মধ্যেও সামগ্রিকভাবে ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মহামারি-পরবর্তী অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়ির মধ্যেও বাংলাদেশ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। সতর্ক ম্যাক্রো ব্যবস্থাপনার কারণে দেশ আরও গভীর সংকটে পড়েনি।
মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, অনেক দেশই একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা কীভাবে সাড়া দিচ্ছি।
অন্তর্বর্তী সরকার ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দেওয়া এবং জরুরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে বলেও জানান অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অর্থনীতি সচল রাখার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে আমরা ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
রাজস্ব আহরণকে বড় দুর্বলতা উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত খুবই কম, যা উন্নয়ন ও জনসেবা অর্থায়নে সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করে। এত কম রাজস্ব নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন।
কর সংস্কার, করভিত্তি সম্প্রসারণ ও সম্মতি (কমপ্লায়েন্স) বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বড় বাধা। রিপোর্ট লেখা ও সুপারিশ দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবায়নই সবচেয়ে কঠিন।
ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল অংশ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও জবাবদিহির অভাব বছরের পর বছর ধরে জনআস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। এগুলো দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যা, সমাধানে সময়, কঠোর নজরদারি ও রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন।
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সীমিত সম্পদের কারণে সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। দেশের জন্য কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা ঠিক করে এগোতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার জনপ্রিয়তানির্ভর সিদ্ধান্ত এড়িয়ে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। নীতিনির্ধারণ সহজ নয়, প্রতিটি সিদ্ধান্তেই সমঝোতা থাকে।
জনগণের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত না হলে তা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্ব প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতের উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা কৃষকদের মতোই পরিশ্রমী ও সক্ষম। তবে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের জন্য তাদের প্রণোদনা, অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং পূর্বানুমেয় নীতিপরিবেশ দরকার।
সালেহউদ্দিন বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জন ভবিষ্যৎ অগ্রগতির শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। আগামীদিনে নির্বাচিত সরকারকে গভীর কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন জোরদার, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং নীতিগত সমন্বয় উন্নত করার ওপর মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার সক্ষমতা রয়েছে। আমাদের মানুষ দৃঢ়, শ্রমশক্তি পরিশ্রমী এবং সম্ভাবনা শক্তিশালী। সঠিক নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে আমরা এগোতে পারবো। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব অংশীজনকে একযোগে কাজ করতে হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তারের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পোবকে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ।
এমএএস/ইএ