দেশজুড়ে

‘আওয়ামী লীগের ঘাঁটি’তে বিএনপির জয়ের পথে বাধা স্বতন্ত্র

আওয়ামী লীগের ‌‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসন। তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গফরগাঁও এবং পাগলা থানা নিয়ে গঠিত এই আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। তবে এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় অন্তর্কোন্দল। এই আসনে ধানের শীষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতা। ফলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন নেতাকর্মীরা। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও বিজয় ছিনিয়ে আনতে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

এই আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বিএনপি মনোনীত গফরগাঁওয়ের পাগলা থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত গফরগাঁও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান (হা়ঁস), জামায়াতে ইসলামীর মো. ইসমাঈল (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র মতিউর রহমান (ফুটবল), ইসলামী আন্দোলনের হাবিবুল্লাহ বেলালী (হাতপাখা), গণসংহতি আন্দোলনের এ কে এম শামসুল আলম (মাথাল), জাতীয় পার্টির প্রার্থী আল আমিন সোহান (লাঙ্গল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাইফুস সালেহীন (কাস্তে) এবং এডিপির সৈয়দ মাহমুদ মোরশেদ (ছাতা)।

স্থানীয়রা জানান, গোলন্দাজ পরিবারের একক নেতৃত্বেই টানা দীর্ঘ বছর এই আসনে আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী ও মজবুত ভিত তৈরি হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই এই আসনের আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁজ নেই। আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের এই শক্তিশালী ঘাঁটিতে বর্তমানে একক আধিপত্য নিয়ে আছে বিএনপি। আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপির প্রার্থী। তবে স্বতন্ত্র, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।

পাগলা থানা এলাকায় নিয়মিত রিকশা চালান আব্দুল কাদির। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এই উপজেলায় মারামারি, সংঘর্ষ দেখবার চাই না। আমরা এলাকার উন্নয়ন চাই। যিনি ভালা (ভালো) মানুষ তারেই ভোট দিবাম (দেবো)।’

গফরগাঁও পৌর এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ‘এই উপজেলা নানান কাণ্ডে আলোচিত। আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। যে কোনো ঘটনায় হত্যার মতো ঘটনা আমরা আর দেখতে চাই না। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে— এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবো।’

দুটি আলাদা থানা এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা চার লাখ ৯ হাজার ৩৬৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৯ হাজার ১২০ জন, নারী ভোটার দুই লাখ ২৪১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তিনজন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হাসেম। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আসনটি হাতছাড়া হয় এবং এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী ফজলুর রহমান সুলতান। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী এনামুল হক জজ মিয়া। নব্বইয়ের গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ফের আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে আসে। এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। ২০০৭ সালের ১৭ জুলাই আলতাফ হোসেন মারা গেলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন। ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালের নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাবেক এমপি আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের পুত্র ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল।

এডিপির প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদ মোরশেদ বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ ও মতবিনিময় করছি। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে সাড়া দিচ্ছে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভোটাররা বিবেচনা করে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে বলে আশা করছি।’

ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাবিবুল্লাহ বেলালী বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বদলে গেছে এলাকার দৃশ্যপট। মানুষ এখন মুক্তভাবে কথা বলতে ও চিন্তা করতে পারছে। অবাধে মত প্রকাশ করতে পারছে। ভোটারদের মতামত আমার পক্ষেই আসবে বলে প্রত্যাশা করছি।’

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইসমাঈল বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। প্রতিটি এলাকায় গণসংযোগে যাচ্ছি, উঠান বৈঠক করছি। এতে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। পরিবর্তনের জোয়ারে নিশ্চয়ই বিজয়ী হবো।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমানের ভাষ্য, ‘এই উপজেলার মানুষের সুখ-দুঃখে দীর্ঘদিন ধরে পাশে আছি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখানের প্রতিটি অলিগলি, মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছি। ভোটাররা আমাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তাই জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’

এ বিষয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘প্রায় সব নেতাকর্মী আমার পক্ষে রয়েছেন। ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের বোঝানো হচ্ছে। ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।’

এসআর