জাতীয়

ভোটের আগমুহূর্তেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র

ভোটের বাকি আর ৪৮ ঘণ্টারও কম। এখনো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ধার হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ। ২০২৪ সালের আগস্টে লুট হওয়া পুলিশের বিপুল সংখ্যক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। ভোটের আগমুহূর্তে ও পরে এসব অস্ত্র বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ভোরে সাভারের চাপাইন এলাকায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে একটি ৭.৬৫ মি. মি. পিস্তল ও দুটি ৭.৬৫ মি. মি. পিস্তল উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচন টার্গেট করে এসব অস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল সন্ত্রাসীদের।

গত শুক্রবার রাজধানী বাড্ডার একটি বাসা থেকে ১১টি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় আটক ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী বলে তথ্য দেয় পুলিশ। একইদিন যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে দুটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার, তিন রাউন্ড গুলি, বিপুল পরিমাণ মাদক ও নগদ অর্থসহ চার শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন শনিবার ফরিদপুরে পুকুর সেচে সাতটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিপুল দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথবাহিনী।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে এমন অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে সামনে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তবে এমন ঘটনাকে নির্বাচনি ‘টুকটাক’ ঘটনা বলে মন্তব্য করে পুলিশ।

সীমান্তের ওপার থেকে অবাধে অস্ত্র চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় প্রতিনিয়তই অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও চট্টগ্রাম সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।

এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এতে ভোটের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি থানার লুট হওয়া ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন গোয়েন্দারা।

গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালিতে ধানের শীষের প্রার্থীর প্রচারণার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। আলীখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ২৫ নম্বর ক্যাম্পে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন আহত হয়। এদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা ও তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক।

অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যান

পুলিশ সদর দপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় পুলিশের ৫৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুণ্ঠিত হয়। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪৪৩২টি। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ১৩৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র।

এখনো উদ্ধার হয়নি যেসব অস্ত্র

চায়না রাইফেল ১১২টি, বাংলাদেশি রাইফেল একটি, চায়না এসএমজি ৩১টি, চায়না এলএমজি ৩টি, চায়না পিস্তল ২০৬টি, ৯ এম এম পিস্তল ৪৫০টি, শটগান ৩৯০টি, গ্যাসগান ১২৯টি, টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার ৭টি এবং ২৬ এম এম সিগন্যাল পিস্তল দুটি।

এছাড়া লুণ্ঠিত গোলাবারুদের সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪টি গোলাবারুদ। উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭১৪৪টি।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযানে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি এবং র‌্যাবের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৯৩টি। অন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৯৬০টি।

সেনাবাহিনী সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ দিনে দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। যার বেশিরভাগই বিদেশি পিস্তল।

বিজিবি সূত্র জানায়, সারা দেশে সীমান্ত এলাকাসহ বিজিবির অভিযানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত এসএমজি দুটি, রাইফেল ১৬টি, রিভলবার পাঁচটি, পিস্তল ৯০টি, অন্য ক্যাটাগরির অস্ত্র ১০২টি, গোলাবারুদ ২ হাজার ৩১১টি, ম্যাগাজিন ৮১টি, মর্টারশেল ১৩টি, গানপাউডার ২০ কেজি, গ্রেনেড ২৩টি, ককটেল ১৯৫টি, মাইন চারটি উদ্ধার করা হয়েছে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাসদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ দিনে দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। যার বেশিরভাগই বিদেশি পিস্তল। সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করেছে।

ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেন্দ্র করে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। যে কোনো সময়ের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো।’

নির্বাচনের আগে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে জানিয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব অস্ত্র নির্বাচনি পরিবেশ আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আতঙ্কের কারণে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হলেও উদ্ধার না হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে থাকবে।’

নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকলেও তফসিল ঘোষণা ও প্রচারণা শুরুর পর মাঠের বাস্তব চিত্র ভিন্নভাবে ধরা পড়ছে। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি কমানো না গেলে এর সরাসরি প্রভাব নির্বাচনি পরিবেশে পড়বে।

তিনি বলেন, ‘লুট হওয়া ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সমাজে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, যা নাগরিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।’

টিটি/এএসএ