ফিচার

ফাঁকা ঢাকা, ঠিক যেন ঈদের আমেজ

নির্বাচনের আগের ঢাকা আজ বড় চেনা, অথচ অচেনা। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট দিতে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢলে রাজধানী যেন হঠাৎ করেই হালকা হয়ে গেছে। ব্যস্ত শহরের রাস্তাগুলো এখন তুলনামূলক ফাঁকা, গণপরিবহনের সংখ্যাও হাতে গোনা। ঠিক যেমনটা দেখা যায় ঈদের আগে; মানুষ যখন আপন ঠিকানার টানে শহর ছাড়ে আর ঢাকা পড়ে থাকে এক ধরনের নীরব উৎসবের আবেশে।

চারপাশে নেই চিরচেনা যানজটের চাপ, নেই অফিসগামী মানুষের তাড়াহুড়া। সড়কে রিকশা আর পাঠাও ড্রাইভারদের দৌরাত্ম্য, ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত যাতায়াত সব মিলিয়ে শহরজুড়ে ঈদের আগমুহূর্তের মতোই এক স্বস্তির অনুভূতি। গুলশান ১ থেকে তোলা ছবিতে ধরা পড়া এই দৃশ্য শুধু একটি মুহূর্তের দলিল নয়, বরং নির্বাচনের আগে ঢাকার বদলে যাওয়া ছন্দের প্রতিচ্ছবি।

নির্বাচনের আগের এই সময়টা ঢাকার জন্য এক অদ্ভুত বিরতি। যেই শহরটি বছরের বেশির ভাগ সময় যানজট, কোলাহল আর তাড়াহুড়ার প্রতীক সে শহরই হঠাৎ যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। অফিসপাড়া, বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক সড়ক সবখানেই মানুষের উপস্থিতি কমেছে। ঢাকাবাসীর বড় একটি অংশ ভোট দিতে নিজের গ্রামে, নিজের শহরে ফিরে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে রাজধানীর দৈনন্দিন চিত্রেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন।

গণপরিবহনের স্বল্পতা এখন চোখে পড়ার মতো। বাসস্টপগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর সংখ্যা কম, অনেক রুটে বাসের দেখা মেলে না সহজে। যে বাসগুলো চলছে, সেগুলোও তুলনামূলক ফাঁকা। পরিবহন শ্রমিকদের অনেকেই এরই মধ্যে গ্রামের বাড়ির পথ ধরেছেন। ফলে ঢাকার চিরচেনা বাসের ভিড়, ধাক্কাধাক্কি আর হুড়োহুড়ির দৃশ্য আপাতত অনুপস্থিত।

এই শূন্যতার মাঝেই দখল বাড়িয়েছে অন্য এক শ্রেণির বাহন। সড়কে এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে রিকশা আর পাঠাওয়ের মতো রাইডশেয়ারিং মোটরসাইকেল। গুলশান ১ এলাকা ঘুরলেই বিষয়টি স্পষ্ট ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত ছুটে চলেছে পাঠাও ড্রাইভাররা আর স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রী তুলছেন রিকশাচালকরা। যানজট না থাকায় যাত্রাও হচ্ছে তুলনামূলক দ্রুত, আয়ও হচ্ছে একটু ভালো। অনেক রিকশাচালকই বলছেন, এমন ফাঁকা রাস্তা ঢাকায় শুধু ঈদের সময়ই দেখা যায়।

গুলশান ১-এর মতো অভিজাত এলাকায়ও এখন অন্যরকম নীরবতা। বড় বড় গাড়ির চাপ কম, ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করতে হয় না দীর্ঘ সময়। ফুটপাথগুলোও বেশ ফাঁকা। যেসব দোকান, রেস্তোরাঁ আর অফিসে প্রতিদিন ছিল ব্যস্ততা, সেগুলোতেও এখন একধরনের ছুটি-ছুটি ভাব। শহরের প্রাণ যেন সাময়িকভাবে গ্রামমুখী।

এই দৃশ্য নতুন নয়। ঈদের আগে এমনকি প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগেই ঢাকার এমন রূপ দেখা যায়। তবে প্রতিবারই বিষয়টি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, ঢাকা আসলে কতটা বহিরাগত মানুষের ওপর নির্ভরশীল। যারা কাজের প্রয়োজনে এখানে থাকেন, ভোটের সময় তারাই হয়ে ওঠেন শহরের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি। আর সেই অনুপস্থিতিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ঢাকার বাস্তব চেহারা কেমন হতে পারে যদি চাপ কিছুটা কমে।

অনেকে মনে করেন, এই ফাঁকা ঢাকাই আসল ঢাকা। যেখানে রাস্তায় চলাচল সহজ, বাতাস কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক আর সময় নষ্ট হয় না যানজটে আটকে থেকে। আবার কেউ কেউ বলেন, এই নীরবতাই প্রমাণ করে ঢাকা মূলত কাজের শহর। কাজ নেই তো শহরও যেন স্তব্ধ।

নির্বাচন শেষে কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য এই চিত্র বদলে যাবে। ভোট দিয়ে মানুষ আবার ফিরবে ঢাকায়, ফিরবে বাসের ভিড়, যানজট, কোলাহল। ফাঁকা রাস্তার এই স্বস্তি তখন হয়ে যাবে স্মৃতি। কিন্তু তার আগের এই সময়টুকু ঢাকাকে দেখার সুযোগ দেয় ভিন্ন এক দৃষ্টিতে; একটি শহর, যে শহর একটু থামতে জানে, বিরতি নিতে জানে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতাই নয়, রাজধানীর সামাজিক ও নগরজীবনের গতিপ্রকৃতিও নতুন করে চোখে আনে। ভোট দিতে বাড়ি ফেরার মানুষের ঢল ঢাকাকে সাময়িকভাবে হালকা করে তোলে। আর সেই হালকা ঢাকাই হয়তো মনে করিয়ে দেয় শহরটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু নির্বাচন নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত জীবনধারা আর টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা।

জেএস/