ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধান অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
তবে শুরু থেকেই দিনাজপুর জেলার ৬টি আসনে ফেসবুক-টিকটকে নির্বাচনি প্রচারণায় মেতেছেন প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে বিলবোর্ড, ব্যানার ও লিফলেটের উপর আস্থা রাখছেন বয়স্করা, আর সামাজিক মাধ্যমে নির্ভর করছেন তরুণ ও প্রবাসী ভোটাররা। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণায় জামায়াতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি।
বিভিন্ন বয়সের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জেলার ৬টি আসনের এই চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়াও কোন আসনে ফেসবুক-টিকটকে কোন দল কী পরিমাণ প্রচারণা চালিয়েছে তার একটি চিত্র জানা গেছে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের (ওএসআইএনটি) মাধ্যমে।
দিনাজপুর- ১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের বীরগঞ্জ উপজেলার সিতলাই এলাকার তরুণ ভোটার হুমায়ুন কবির বলেন, বিএনপি-জামায়াত উভয় দলই সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কিন্তু জামায়াতের ভিডিও, ছবি ও টিকটকগুলো বেশি অরগানিক। তাদের নেতাকর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে গড় ভিউ বিএনপির বেশি।
কাহারোল উপজেলার জয়নন্দ এলাকার রামু দাস বলেন, ফেসবুক খুললেই নির্বাচনি প্রচারণার ভিডিও, ছবি ও স্ট্যাটাস ভেসে উঠছে। এতে তরুণ ভোটাররা আকৃষ্ট হচ্ছেন।
দিনাজপুর-২ (বোচাগঞ্জ-বিরল) আসনে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগাচ্ছেন তরুণ ও প্রবাসী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে।
বোচাগঞ্জ উপজেলার বকুলতলা এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণার কারণে সাধারণ ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তারা তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন, আসলে কোনটা সঠিক।
বিরল উপজেলার রানীপুকুর এলাকার আব্দুস সালাম বলেন, পোস্টার না থাকাটাই ভালো হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার গুণে প্রার্থীদের দোষ ত্রুটি জানতে পারছি। প্রার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোও রেখে দিতে পারছি।
দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে বিএনপি সোশ্যাল মিডিয়াকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছে। কমলপুর এলাকার আলি রিয়াজ বলেন, পোস্টার-ব্যানার পরিবেশ নষ্টের পাশাপাশি ব্যয়বহুল। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই খরচটা কম হলেও একে অপরের প্রতি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছেন। সত্য-মিথ্যা বুঝতে পারাটাও কঠিন।
শহরের বালুবাড়ী এলাকার জুয়েল ইসলাম বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন ৪০ শতাংশ ভোটারকে খুব সহজেই প্রার্থীরা তাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারছেন। এতে করে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে সঠিক জায়গায় ভোট দিতে পারবেন।
দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) বিএনপি-জামায়াতের জনপ্রিয়তা এতটাই কাছাকাছি যে নির্ণয় করে বলা খুব কঠিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণাতেও তারা সমানে সমান। দিনাজপুর জেলার মধ্যে এই আসনটিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার আগে থেকেই বেশি।
খানসামা উপজেলার পাকেরহাট এলাকার সোলায়মান আলী বলেন, পোস্টার ব্যানার না থাকায় নির্বাচনের ইমেজটা জমছে না। আমরা বয়স্ক মানুষরা লিফলেট নির্ভর হয়ে আছি।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী) আসনে বিএনপি ও এনসিপি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।
পার্বতীপুর এলাকার ফকিরপাড়া গ্রামের আনিসুর রহমান বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে আগামীতে প্রার্থীরা আর বাসায় ভোট চাইতে আসবে না। তারা সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর হয়ে পড়বে।
দিনাজপুর-৬ (বিরামপুর-হাকিমপুর-নবাবগঞ্জ ঘোড়াঘাট) আসনে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের পাশাপাশি ভোটারদের কাছেও যাচ্ছেন প্রার্থীরা।
নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ এলাকার আব্দুল মান্নান বলেন, ভোটের মাঠে এবার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার একটি নতুন ধারণা। অন্যান্য নির্বাচনে এতো প্রচারণা দেখা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছে।
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের পর্যালোচনাওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্সের (ওএসআইএনটি) চারটি সোর্স পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দিনাজপুর জেলায় ৬টি আসনে ১০০ ভাগের মধ্যে গড়ে বিএনপি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ, জামায়াত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা গড়ে ১০ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি) এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ৩টা পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ার রিচ ও ভিউ পেয়েছে দিনাজপুর-১ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ৫.৫ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ৯০হাজার+। এই আসনে জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ২.৮ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ৪২হাজার+। দিনাজপুর-২ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ৪.২ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ৬০হাজার+। জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ১.৫ লাখ+ ও গড় ভিডিও ভিউ ২৫হাজার+। দিনাজপুর-৩ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ৯.৫ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ২.৫লাখ+। এই আসনে জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ৪.২ লাখ+ ও গড় ভিডিও ভিউ ১.২লাখ+। দিনাজপুর-৪ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ৫.২ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ৮৫হাজার+। ওই আসনে জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ৩.৫ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ৭০হাজার+। দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ৭.৫ লাখ+, গড় ভিডিও ভিউ ১.৮লাখ+। জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ২.২ লাখ+ ও গড় ভিডিও ভিউ ৫০হাজার+। দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপির মাসিক গড় রিচ ১১ লাখ+ ও গড় ভিডিও ভিউ ৪লাখ+। একই আসনে জামায়াতের মাসিক গড় রিচ ৬.৫ লাখ+ ও গড় ভিডিও ভিউ ২.৫লাখ+।
এফএ/এএসএম