ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের তরুণ সমাজের প্রত্যাশা এবার বেশ জোরালো। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ হওয়ায় আগামী সরকারের নীতিনির্ধারণে তাদের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে নারীর নিরাপত্তা, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা করছেন তরুণরা।
তরুণ সমাজের সবচেয়ে বড় দাবি বেকারত্ব দূর করা। শিক্ষিত তরুণদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগ আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা তৈরিতে কর ছাড়, স্টার্টআপ ফান্ড, সহজ শর্তে ঋণ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সুবিধা দেওয়ার দাবি করছেন তরুণরা।
একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট জবের সুযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে সহজীকরণ, দ্রুত ইন্টারনেট সেবা এবং আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বিস্তারের প্রত্যাশা তরুণদের। তাদের মতে, সঠিক সহায়তা পেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস হতে পারে এই খাত।
আরও পড়ুনব্যবসার ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি চান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাপ্রচারণায় বাধা-হামলা জনমনে বাড়াবে আতঙ্ক, ভোটদানে পড়বে ভাটানির্বাচনি প্রচারণায় বাসের ব্যবহার কীভাবে শুরু হলো?বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগদানের নেপথ্যে কী?
নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তরুণ সমাজের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং নারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়াতে ডে-কেয়ার সেন্টার, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন তরুণরা।
শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট-টাইম চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকলে শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে—এমনটাই মনে করেন তরুণরা। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রস্তাবও উঠে এসেছে।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কারিকুলামে বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য ও ডিজিটাল করা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রত্যাশাও রয়েছে।
তরুণ সমাজ মনে করে, আগামীর সরকার যদি তাদের এই প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে একটি দক্ষ, উদ্ভাবনী ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুনপ্রতিশ্রুতি নয়, স্বচ্ছ নীতি ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ চান ব্যবসায়ীরা৫০ গজের মধ্যে ৫ প্রার্থীর নির্বাচনি অফিস, সহনশীলতার ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’নাগরিক বঞ্চনার অবসান চান ভোটাররা, আশা দেখাচ্ছেন প্রার্থীরাসর্বাধিক প্রার্থীর আসনে আগ্রহ বেশি তিন ‘সাইফুলে’
দেশের অনেক তরুণ এখন পড়ালেখা শেষ করে নিজে কিছু করার আশায় উদ্যোক্তা হয়ে উঠছেন। নিজেদের মেধা আর স্বল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন, যেখানে মেধাই মূলধন।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিএসই বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে নিজেকে আইটি উদ্যোক্তার খাতায় নাম লিখিয়েছেন ইব্রাহিম খান। প্রতিষ্ঠা করেছেন গিকসর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
এই তরুণ উদ্যোক্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘একজন আইটি স্টার্টআপ উদ্যোক্তা হিসেবে আমার প্রত্যাশা খুব সাধারণ। নির্বাচিত সরকার যেন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ফান্ডিং ব্যবস্থা, কর সুবিধা এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অর্থায়নের সুযোগের অভাব, দক্ষ জনবল তৈরি না হওয়া এবং নীতিগত সহায়তার ঘাটতি। সরকার যদি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের জন্য ইনকিউবেশন, প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগ বাড়ায়, তাহলে বাংলাদেশের আইটি স্টার্টআপ খাত অনেক দ্রুত এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
ব্যবসায় ইনকিউবেশন হলো নতুন বা প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপ ব্যবসাকে সফল করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা, প্রশিক্ষণ, অফিস স্পেস, পরামর্শ এবং বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে লালন-পালন করার একটি প্রক্রিয়া।
আরও পড়ুনআওয়ামী লীগের দুর্গ গোপালগঞ্জ, ভোট নিয়ে কী ভাবছেন ভোটাররা?গ্যাস-পানির সংকট থাকা বাড্ডাবাসী চান ‘ত্রাণকর্তা’১১ প্রার্থীর ৯ জনই ‘মাঠে নেই’, দুই প্রার্থীর দিকে তাকিয়ে এলাকাবাসীসুপরিকল্পিত পুরান ঢাকা গড়তে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ চান ভোটাররা
যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মুজাহিদ খান আগামীর সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে যে সরকারই আসুক তাদের কাছে তরুণ হিসেবে আমার চাওয়া অনেক। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ মেধাবী শিক্ষিত সমাজকে দেশে রাখা খুবই জরুরি। বিগত সময়ের হিসেবে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলেও শিক্ষিত তরুণদের মূল সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার বড় অসামঞ্জস্য। অনার্স, মাস্টার্স শেষ করেও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ খুব সীমিত। সরকারি চাকরিকেন্দ্রিক মানসিকতা ও বেসরকারি খাতের দুর্বলতা সমস্যাগুলা আরও অনেক বাড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশ অনেক এগিয়ে থাকে। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নিরাপদ পরিবেশ, নীতি সহায়তা ও পর্যাপ্ত পুঁজির ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে। তাছাড়া যে বিষয়টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা হলো— রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। যেটা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব তরুণদের আস্থাকে ক্রমেই নষ্ট করছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শিক্ষিতরা বিদেশমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা যেন তারা এই বিষয়গুলাকে আমলে নিয়ে দেশ গঠনে মনোনিবেশ করে।
কুষ্টিয়ার ফরহাদ আহমেদ পড়ালেখা শেষ করে একটি সরকারি চাকরির আশায় নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে চাওয়া থাকবে স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা; যেখানে প্রশ্ন ফাঁস, ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগসহ অন্যান্য দুর্নীতি থাকবে না; নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। আর মেধাকে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, যাতে আমাদের আগামী প্রজন্ম মেধাবী হয়ে ওঠে।’
আরও পড়ুনগোপালগঞ্জে ‘কারাগার বনাম মাঠ’ ত্রিমুখী লড়াইটাঙ্গাইল-৭ আসনে ভোটের আমেজ কম, কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে শঙ্কাবিএনপির রাজ্যে হাসনাতের পথ আটকাতে মাঠে ট্রাকনির্বাচনে ঋণ খেলাপিদের অংশগ্রহণ, দায় কার?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোস্তফা ইকবাল হৃদয় বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষা, চিকিৎসা খাতে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন জরুরি যাতে চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী না হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণামূলক কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে। দেশের সব মানুষের মৌলিক অধিকার যেন নিশ্চিত হয় সে বিষয়ে সরকারকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।’
তবে নারীর কর্মসংস্থান, কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধাসহ বেশ কিছু দাবি-প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী নাছরিন আক্তার। তিনি বলেন, নারীদের জন্য চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন যেন তারা সন্তান লালনপালনের পাশাপাশি নিরাপদে চাকরি করতে পারে। শিক্ষায় প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্মীয় বিষয় সব ক্লাসে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ আমাদের মধ্যে অনেক ধর্মীয় জ্ঞানের স্বল্পতা রয়েছে।
নাছরিন আক্তার বলেন, ‘আমাদের দেশে পার্টটাইম চাকরির তেমন সুযোগ নেই। নতুন সরকারের কাছে আমার চাওয়া, আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা হোক যেন পড়াশোনার পাশাপাশি সহজে ছোট একটি পার্টটাইম চাকরি করা যায় এবং নিজেদের খরচ নিজেরাই বহন করতে পারি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে গেলে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, যেন সবাই কোনো ভোগান্তি ছাড়াই স্বল্পমূল্যে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।’
এনএস/এমএমএআর/