দেশজুড়ে

‘মানুষের চাওয়া একটাই—রক্তপাতহীন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’

অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেড় যুগেরও বেশি সময় পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশ। যেখানে দীর্ঘ বিরতির পর ভোটাররা স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বপ্ন দেখছেন। তরুণ ভোটাররা, বিশেষ করে যারা গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি, তাদের মধ্যে কাজ করছে প্রবল উত্তেজনা। এরইমধ্যে সরকারি ছুটির আমেজে বাড়ির টানে ছুটছেন মানুষ। শেষ মুহূর্তে পাড়া-মহল্লা থেকে অলিগলি সর্বত্র চলছে ভোটের আলোচনা।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন দেখা দিয়েছে উৎসবের আমেজ, তেমনি জনমনে উঁকি দিচ্ছে অজানা শঙ্কা। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, তবুও ভোটারদের মাঝে নানা শঙ্কা কাজ করছে। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার খবর জনমনে অস্বস্তি তৈরি করছে।

রংপুর নগরীর কটকিপাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা সাব্বির। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানুষের চাওয়া একটাই—একটি রক্তপাতহীন, স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রচারণাকালীন সময়ের উস্কানিমূলক বক্তব্য এক অজানা আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।’

শালবন এলাকার তরুণ ভোটার শিক্ষার্থী আহমেদ সাকিব বলেন, ‘এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবো। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ভোট ঘিরে যেমন উদ্দীপনা বিরাজ করছে, তেমনি শঙ্কাও কাজ করছে—না জানি কখন কী হয়।’

রংপুর নগরীর আমাশু কুকরুল এলাকার ব্যবসায়ী অমলেন্দু রায় বলেন, ‘দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই নির্বাচন একটি অগ্নিপরীক্ষা। উৎসবের জয় হবে নাকি শঙ্কা সব আনন্দকে ম্লান করে দেবে, তা নির্ধারণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে। তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চাওয়া একটাই— কোনো সহিংসতা নয়, একটি উৎসবমুখর পরিবেশে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।’

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুলিশ লাইনসে পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনি ব্রিফিং প্যারেড শেষে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন বলেন, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ছয় স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি থাকবে পুলিশের বডি-ওর্ন ক্যামেরা।

এসপি মারুফাত হুসাইন বলেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনসহ কেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, ভোট প্রত্যাশী ও নির্বাচনে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদির নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের কাছে থাকবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মাঠে পুলিশের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, আনসারসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। রংপুর জেলায় ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

রংপুর জেলার নির্বাচনি পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি উল্লেখ করে এসপি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এটি বজায় থাকবে। সেইসঙ্গে ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা হবে।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের তিনটির আংশিক অংশে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এসব স্থানের ২০৪টি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনসহ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনি দায়িত্বে ৩০টি প্যাট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স কাজ করবে।

জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ২১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি কেন্দ্রগুলো সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি ও আট উপজেলায় ৯৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

রংপুরের ছয়টি আসনে মোট ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩১ জন।

জিতু কবীর/এসআর/জেআইএম