পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ নামাজ, ফরজ নামাজের কাজা ও ওয়াজিব নামাজ অর্থাৎ বেতরের নামাজ ছাড়া অন্যান্য সব নামাজকেই নফল নামাজ বলা হয়। ফরজের সাথে প্রতি ওয়াক্তে আমরা যে সুন্নত নামাজগুলো আদায় করি, সেগুলো নফল নামাজ। সকালের ইশরাকের নামাজ, চাশতের নামাজ, মাগরিব পরবর্তী আওয়াবিনের নামাজ, শেষ রাতের তাহাজ্জুদের নামাজ, তাহিয়্যাতুল অজু ও তাহিয়্যাতুল মসজিদও নফল নামাজ। এ ছাড়াও দিনে রাতে নামাজের নিষিদ্ধ ও মাকরুহ সময়গুলো ছাড়া যে কোনো সময় নফল নামাজ আদায় করা যায়।
আমাদের প্রত্যেকটি কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত বা প্রত্যেকটি কাজের প্রতিদান আমরা পাবো আমাদের নিয়ত অনুযায়ী। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, প্রত্যেক কাজ নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে। (সহিহ বুখারি: ১)
নিয়ত হল মনে কোনো কাজের দৃঢ় ইচ্ছা করা। এই ইচ্ছা সব আমলের জন্য জরুরি। নামাজের জন্যও জরুরি। কেউ যখন নামাজে দাঁড়াবে, তার অন্তরে নিয়ত থাকতে হবে, তার জানা থাকতে হবে যে সে নামাজ শুরু করছে, কোন নামাজ শুরু করছে, কত রাকাত নামাজ সে পড়বে ইত্যাদি। অন্তরের এই ইচ্ছা ও জানা থাকার নামই নিয়ত।
মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা জরুরি নয়। তবে কেউ যদি অন্তরের নিয়তের পাশাপাশি নিয়তের বিষয়টি মুখেও উচ্চারণ করতে চায় তবে তারও অবকাশ আছে। কেউ মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করলে তা নাজায়েজ বা বিদআত হবে না।
সুন্নত নামাজগুলোসহ কোনো নফল নামাজের জন্যই ওয়াক্ত বা কোন নামাজ তা নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা জরুরি নয়। শুধু ‘নামাজ আদায় করছি’ এ রকম নিয়তে আদায় করলেও হয়ে যাবে।
কেউ যদি ফজরের আগে দুরাকাত, জোহরের আগে চার রাকাত, মাগরিবের পর দুরাকাত বা ইশার পর দুরাকাত নামাজ শুধু নামাজ পড়ার নিয়তে আদায় করে তাহলে তা ওই ওয়াক্তের সুন্নত হিসেবেই আদায় হবে।
শেষ রাতে শুধু ‘নামাজ আদায় করছি’ বা ‘নফল নামাজ আদায় করছি’ এমন নিয়ত করে নামাজ আদায় করলেই তা তাহাজ্জুদের নামাজ গণ্য হবে। ইশরাক, চাশত বা আওয়াবিনের সময়ও শুধু নফল নামাজ আদায়ের নিয়তই যথেষ্ট। তবে নামাজ নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা ভালো।
যে কোনো সুন্নত/নফল নামাজের নিয়তযে কোনো সুন্নত/নফল নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে দুই/চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি’। তারপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করবেন।
এভাবে নিয়ত করলে যে কোনো নফল ও সুন্নত নামাজ শুদ্ধ হবে। পাশাপাশি এখানে আমরা নামাজ নির্দিষ্ট করে নিয়ত করারও কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি।
পাঁচ ওয়াক্তের সুন্নত নামাজের নিয়তপাঁচ ওয়াক্তের সুন্নত নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে ফরজের দুই রাকাত বা জোহরের দুই/চার রাকাত বা মাগরিবের দুই রাকাত বা ইশার দুই রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করছি’। তারপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করবেন।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ততাহাজ্জুদের নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে তাহাজ্জুদের দুই/চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি’। তারপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করবেন।
ইশরাক নামাজের নিয়তইশরাকের নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে ইশরাকের দুই/চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি’। তারপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করবেন।
আওয়াবিন নামাজের নিয়তআওয়াবিনের নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিবলামুখী হয়ে আওয়াবিনের দুই/চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি’। তারপর আল্লাহু আকবার বলে নামাজ শুরু করবেন।
নফল নামাজের নিয়মদিন ও রাতের নফল নামাজ এক সালামে চার রাকাত করে পড়া উত্তম, দুই রাকাত করে পড়াও জায়েজ। দিনের নফল নামাজ এক সালামে চার রাকাতের বেশি পড়া মাকরুহ। আর রাতের নফল নামাজ এক সালামে আট রাকাতের বেশি পড়া মাকরুহ। রাতে এক সালামে ছয় বা আট রাকাত নফল নামাজ পড়া অনুত্তম হলেও মাকরুহ নয়।
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি আয়েশাকে (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমজান মাসে কত রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন? তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমাজান অথবা অন্য সময় ১১ রাকাতের বেশি নফল নামাজ আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকাত আদায় করতেন। কী রকম একাগ্রতা নিয়ে ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তিনি সেই নামাজ আদায় করতেন সে বিষয়ে তুমি জিজ্ঞেস করো না। তারপর আবার চার রাকাত নামাজ আদায় করেন। ওই চার রাকাত নামাজও তিনি অসাধারণ একাগ্রতা নিয়ে ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে আদায় করতেন। এরপর ৩ রাকাত নামাজ আদায় করতেন। (শামায়েলে তিরমিজি)
এক সালামে দুই রাকাতের বেশি অর্থাৎ চার, ছয় বা আট রাকাত নফল নামাজ পড়লে প্রতি রাকাতেই সুরা ফাতিহার পর অন্য সুরা মেলানো ওয়াজিব। ফরজ নামাজের মত নফল নামাজে তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে বা পরবর্তী রাকাতগুলোতে শুধু সুরা ফাতেহা পড়ার নিয়ম নেই।
নফল নামাজে প্রতি দুই রাকাত পর পর বৈঠক করা ও ওই বৈঠকে তাশাহহুদ পড়া ওয়াজিব। যেহেতু নফল নামাজের প্রতি দুই রাকাত একটি স্বতন্ত্র নামাজ হিসেবে গণ্য হয়, তাই প্রত্যেক দুই রাকাত পর বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ শরিফ ও দোয়া পড়া উত্তম এবং প্রত্যেক দুই রাকাত শেষে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে নতুন করে সানা ও আউজুবিল্লাহ পড়া উত্তম।
ওএফএফ